বড় শক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি: ভারসাম্য রক্ষার নতুন পরীক্ষা

0
ড় শক্তির প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি
ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, লোকসমাজ : বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন একাধিক শক্তির স্বার্থ, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও নতুন করে পর্যালোচনার পর্যায়ে এসেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি কোনো একটি শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া বা দূরে থাকার চেয়ে বেশি—বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কীভাবে বজায় রাখা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পরবর্তী বক্তব্যে তিনি বলেন, পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো চুক্তিগুলোর অসঙ্গতি চিহ্নিত করা এবং বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো বিধান থাকলে তা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া; সব চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এমন কথা তিনি বলেননি।

এর কয়েক দিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, এ বিষয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এলে ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

ঘটনাটি তাই শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পর্যালোচনার বিষয় নয়; এর মধ্য দিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ, চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি এবং ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী স্বার্থ—তিনটি ভিন্ন মাত্রা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করছে।

যুক্তরাষ্ট্র: বাণিজ্য থেকে কৌশলগত সম্পর্ক

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়েও গুরুত্ব পেয়েছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তিটির লক্ষ্য দুই দেশের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বাণিজ্য বাধা মোকাবিলা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করা। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পণ্যের বাজারপ্রবেশ, শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা অতীতের কূটনৈতিক চাপের আলোকে দেখার সুযোগ কমছে। রপ্তানি বাজার, শুল্ক, বিনিয়োগ, সরবরাহশৃঙ্খল, প্রযুক্তি ও জ্বালানি—সবই এখন সম্পর্কটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশের জন্য এখানে মূল বিবেচনা হলো অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি কোনো একটি বাজার বা সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না করা। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে বাণিজ্যনীতির সঙ্গে যুক্ত করছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থের আন্তঃসম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে।

চীন: অবকাঠামো থেকে কৌশলগত সহযোগিতা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের পরিধিও গত কয়েক বছরে বিস্তৃত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এতে যুক্ত হয়েছে।

২০২৬ সালের ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এই সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপথকে আরও স্পষ্ট করেছে। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়। দুই দেশ সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপের ব্যবস্থা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের কাঠামো অনুসন্ধানের বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, তিস্তা ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক যোগাযোগও আলোচনায় এসেছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের একটি বড় বাস্তবতা হলো বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। একই অর্থবছরে চীন ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ঘাটতির অংশীদারদের একটি।

তাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

বড় অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, বন্দর, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও প্রকল্পের অর্থনৈতিক ফল, অর্থায়নের শর্ত, স্থানীয় শিল্পে প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। সম্পর্কের পরিধি যত বাড়ে, এসব বিষয়ও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ভারত: ভৌগোলিক বাস্তবতার সবচেয়ে জটিল সম্পর্ক

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বাস্তবতা অন্য দুই শক্তির তুলনায় ভিন্ন। প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, নদীর পানি এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের সরাসরি প্রতিবেশী এবং বহুমাত্রিক অংশীদার।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁকে ফেরত পাঠানোর দাবি, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পাশাপাশি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের বিষয়গুলোও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

এ কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কের নিজস্ব ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় ইস্যু রয়েছে।

১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ সেই সম্পর্কের নতুন মূল্যায়নের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। তবে পর্যালোচনা মানেই সব চুক্তি বাতিল বা সংশোধন করা হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বরং সরকারের বক্তব্যে চুক্তিগুলো পরীক্ষা করে অসঙ্গতি বা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী বিধান থাকলে তা চিহ্নিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কোনো চুক্তি কোন সরকারের সময়ে হয়েছে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে চুক্তিটির আইনি কাঠামো, বাস্তব প্রয়োগ, অর্থনৈতিক ফল, নিরাপত্তাগত প্রভাব, পারস্পরিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ দায়।

সামনে গঙ্গার পানি চুক্তির প্রশ্ন

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি ৩০ বছরের জন্য করা হয়েছিল এবং ২০২৬ সালে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রও জানান, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও কারিগরি পর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।

অতএব ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার পাশাপাশি পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগের মতো মৌলিক দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে থাকবে।

তিস্তা ও ভারত-চীন সমীকরণ

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভারত-চীন প্রতিযোগিতা। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতার সম্ভাবনা যেমন বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতেরও এ বিষয়ে স্বার্থ রয়েছে।

চীনের সঙ্গে জুনের যৌথ ঘোষণায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়টি এসেছে। একই সঙ্গে দুই দেশ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে সম্ভাব্য ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপ নিয়েও কাজ করার কথা জানিয়েছে।

এ ধরনের প্রকল্পে বিদেশি অংশীদার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অর্থায়ন বা প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব, পরিচালন ব্যয়, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগ—সবকিছু বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তাও এখন পররাষ্ট্রনীতির অংশ

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত। এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারদর, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার পরিবর্তন দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত মজুত—এসব বিষয়ও অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়ন

বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। চীনের সঙ্গে জুনের যৌথ ঘোষণায় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিনিময়, সফর ও প্রশিক্ষণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘টু-প্লাস-টু’ সংলাপের কাঠামো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ভবিষ্যতে কোনো নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো বা সহযোগিতায় বাংলাদেশ যুক্ত হলে তার প্রভাব শুধু সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত নির্ভরতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় আসবে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতির নতুন বাস্তবতা

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের পরিচিত নীতি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নীতিটির প্রয়োগ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারে না। আবার কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তাই যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে একই মাপকাঠিতে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধানত রপ্তানি বাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; চীনের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, শিল্প, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বড় ক্ষেত্র; আর ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সরাসরি সম্পর্কিত।

এই পার্থক্যগুলো বিবেচনায় নিয়েই খাতভিত্তিক জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে মূল পরীক্ষা কোথায়

সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে এখন এমন কোনো অবস্থায় সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক জোটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। বরং বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ, চীনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিস্তার এবং ভারতের নিরাপত্তা ও প্রতিবেশী স্বার্থ একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

১০১টি ভারতীয় চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে এর ফল কী হবে, তা নির্ভর করবে পর্যালোচনার মানদণ্ড, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে তাই মূল বিষয় কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ হবে—শুধু তা নয়। বরং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্র, সুযোগ, ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বড় শক্তির প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি দূরে থাকতে পারবে না। একইভাবে কোনো একটি শক্তির কৌশলগত হিসাবের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়লে নতুন ধরনের নির্ভরতা তৈরি হওয়ার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির কার্যকারিতা নির্ভর করতে পারে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি, অর্থনৈতিক হিসাব, নিরাপত্তাগত মূল্যায়ন এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের মূল্যায়ন শুধু কত বড় শক্তির সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো—এ দিয়ে হবে না। বরং বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কতটা বজায় রাখা গেল, সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন।