তারুণ্যে ভর করে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি জামায়াতের, ১২ প্রার্থী চূড়ান্ত

0
চার সিটিতে জামায়াতের মেয়র প্রার্থীরা (ওপরে বাঁ থেকে) নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বার এবং গাজীপুরে হাফিজুর রহমান; (নিচে বাঁ থেকে) চট্টগ্রামে শামসুজ্জামান হেলালী এবং রংপুরে এ টি এম আজম খান।। ছবি: সংগৃহীত

সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় জোটে অংশ নিলেও আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ইতিমধ্যে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে ১২ জন সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি। এ ক্ষেত্রে তরুণ নেতৃত্বকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ১১-দলীয় ঐক্যের ব্যানারে অংশ নিয়েছিল। ওই মোর্চায় জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) আরও কয়েকটি ইসলামি দল ছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিশেষ করে সিটি করপোরেশনে, দলটি এককভাবেই মাঠে নামতে চায় বলে জামায়াত নেতারা স্পষ্ট করেছেন।

তরুণদের সামনে আনার পরিকল্পনা:

২০২৪ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে চায় জামায়াত। দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতারাও এই পরিকল্পনায় রয়েছেন। এছাড়া একসময় কেবল শপথধারী রুকনদের মনোনয়ন দেওয়া হলেও এখন সেই নীতি থেকে সরে এসেছে দলটি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কর্মী-সমর্থক এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় নির্বাচনেও একই নীতি অনুসরণ করা হতে পারে।

চার সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা:

স্থানীয় শাখাগুলো থেকে তিন সদস্যের প্যানেল চেয়ে সেই তালিকা যাচাই করেই সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। ইতিমধ্যে চার সিটিতে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করতে বলা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সিটিতে মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহানগর আমির আবদুল জব্বার, যিনি ২০১২-১৩ মেয়াদে শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি এবং ২০১৪-১৫ মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। গাজীপুর সিটিতে প্রার্থী হচ্ছেন তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি হাফিজুর রহমান। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৬ আসনে প্রার্থী থাকলেও উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি প্রার্থিতা হারিয়েছিলেন।

চট্টগ্রাম সিটিতে প্রার্থী হচ্ছেন দলের নগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী। রংপুর সিটিতে প্রার্থী হচ্ছেন দলের মহানগর আমির এ টি এম আজম খান।

ঢাকার দুই সিটিতে কারা:

ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। দক্ষিণ সিটিতে আলোচনায় রয়েছেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক ওরফে সাদিক কায়েম। তাকে প্রার্থী করার খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে কিছু সমালোচনাও তৈরি হয়। তবে জামায়াত নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় পর্যন্ত তার ডাকসু মেয়াদ ও ছাত্রত্ব উভয়ই শেষ হয়ে যাবে, ফলে প্রার্থী হতে সাংগঠনিক কোনো বাধা থাকবে না।

ঢাকা দক্ষিণে এনসিপি তাদের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেছিল। তবে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ এতে আপত্তি তুলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে এবং তাকে সমর্থন দিলে রাজনৈতিক দায়ভার জামায়াতের ওপর পড়বে বলে তারা মনে করেন।

একক পথের কারণ:

জামায়াত নেতারা মনে করছেন, অতীতে বিএনপির সঙ্গে চার-দলীয় জোটে থেকেও আলাদাভাবে নির্বাচন করে তারা বেশি সফলতা পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এবার একক প্রস্তুতির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি দলটি মনে করছে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের জনসমর্থন বেড়েছে এবং নিজেদের তারা এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানান, প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ প্রায় শেষ। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন পরিচালনা কমিটি গঠন ও গণসংযোগ শুরু হবে। সিটি নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন দলের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও।

এনসিপিও আলাদা প্রস্তুতিতে:

জোটের সম্ভাবনা নাকচ না করলেও এনসিপিও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। গত ২৯ মার্চ পাঁচটি সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। সম্প্রতি ১০০টি পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামও প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ২০ মে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানিয়েছেন, জোটগত না একক — সেই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে নেওয়া হবে। তবে ব্যাপক প্রস্তুতির লক্ষ্যেই এখন আলাদা প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কবে:

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়সীমার ইঙ্গিত মিলছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরু হবে এবং সব নির্বাচন শেষ হতে প্রায় ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে।

এদিকে জামায়াত দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। দলটির অভিযোগ, বিএনপি ১১টি সিটিতে নিজেদের নেতাদের প্রশাসক বসিয়ে রেখেছে এবং চট্টগ্রাম সিটিতে বিএনপির শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্বে আছেন। জামায়াতের বক্তব্য, দলীয় প্রশাসকদের রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এবং সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এভাবে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ নেই।