জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ও যশোর-খুলনার আত্মীয়তা

২৫ বৈশাখে এক ঐতিহাসিক সম্পর্কের ফিরে দেখা

0

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি ও যশোর-খুলনার আত্মীয়তা

শিকদার খালিদ : 
২৫ বৈশাখ মানেই বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি আর আত্মপরিচয়ের এক অনন্য দিন। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—যিনি শুধু বাংলা ভাষার নন, সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর সাহিত্য, গান ও দর্শন আজও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে জীবন্ত। কিন্তু অনেকেরই অজানা, কলকাতার জোড়াসাঁকোর সেই বিশ্ববিখ্যাত ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যশোর-খুলনা অঞ্চলের সম্পর্ক কেবল সাহিত্যিক বা জমিদারির ছিল না; ছিল গভীর পারিবারিক আত্মীয়তার বন্ধনও।
এই সম্পর্কের ইতিহাস জানলে বিস্মিত হতে হয়। কারণ, বিশ্বকবির পরিবারকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক নবজাগরণের কথা আমরা জানি, তার এক গুরুত্বপূর্ণ শিকড় ছড়িয়ে আছে বর্তমান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।
পিরালী ব্রাহ্মণ ও যশোর অঞ্চলের যোগসূত্র
ঠাকুর পরিবার মূলত “পিরালী ব্রাহ্মণ” সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, সামাজিক ও ধর্মীয় নানা কারণে তৎকালীন উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ সমাজ তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখত। ফলে ঠাকুর পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্রধানত যশোর-খুলনা অঞ্চলের পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারগুলোর সঙ্গে।
এই সূত্রেই যশোর, খুলনা ও আশপাশের বহু সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আত্মীয়তা তৈরি হয়। আজও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক পুরোনো পরিবারে সেই ইতিহাসের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে লোককথা, বংশলতিকা ও পারিবারিক স্মৃতিচারণে।
নরেন্দ্রপুরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি
বিশ্বকবির মেজদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী—নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, অনুবাদক ও চিত্রশিল্পী। তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী-এর পৈতৃক নিবাস ছিল যশোরের নরেন্দ্রপুরে—এমন তথ্য বিভিন্ন রবীন্দ্র-গবেষণা ও পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কাদম্বরী দেবী বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের এক রহস্যময় ও আবেগঘন চরিত্র। রবীন্দ্রনাথের কৈশোর ও সাহিত্যজীবনের শুরুর দিনগুলোতে তিনি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহচর্য ও অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস। সাহিত্যবোদ্ধাদের মতে, রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল মনোজগত গঠনে কাদম্বরী দেবীর প্রভাব ছিল গভীর।
যশোরের নরেন্দ্রপুরের সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থানীয় মানুষের কাছেও দীর্ঘদিন ধরে গর্বের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
দক্ষিণডিহি: বিশ্বকবির শ্বশুরবাড়ি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের শ্বশুরবাড়িও ছিল বর্তমান খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে। তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবী-এর বাল্যনাম ছিল ভবতারিণী। দক্ষিণডিহির রায়চৌধুরী পরিবারের কন্যা ভবতারিণীকে বিয়ের পর নতুন নাম দেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর—“মৃণালিনী”।
আজও দক্ষিণডিহি গ্রামে গেলে স্থানীয় মানুষ ঠাকুর পরিবারের নানা স্মৃতি, গল্প ও কিংবদন্তির কথা বলেন। সেখানে রয়েছে রবীন্দ্র-স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন স্থাপনা ও নিদর্শন। প্রতিবছর ২৫ বৈশাখকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনও হয়ে থাকে।
শিলাইদহ থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সাহিত্যভূমি
বর্তমান কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, যা একসময় বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের অংশ ছিল, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেন বহু বিখ্যাত কবিতা, গান, গল্প ও চিঠি।
পদ্মা নদীর বুকে নৌভ্রমণ, গ্রামবাংলার জীবন, কৃষকের দুঃখ, বর্ষার প্রকৃতি—সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার জীবনচিত্র তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। “ছিন্নপত্র”, “সোনার তরী”, “পোস্টমাস্টার”, “সমাপ্তি” কিংবা অসংখ্য রবীন্দ্রসংগীতে এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
যশোর-খুলনার মানুষের কাছে কেন বিশেষ রবীন্দ্রনাথ?
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আমার সোনার বাংলা-এর রচয়িতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ গোটা জাতির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তবে যশোর-খুলনা অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁর গুরুত্ব যেন আরও একটু বেশি আত্মীয়তার।
কারণ, এই অঞ্চলের মাটি, মানুষ, পারিবারিক সম্পর্ক ও প্রকৃতি তাঁর জীবন ও সাহিত্যকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। তাই ২৫ বৈশাখ এ অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি জন্মজয়ন্তী নয়; এটি এক আত্মীয় মানুষকে স্মরণ করার দিনও বটে।
আজ যখন নতুন প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে শুধু পাঠ্যবইয়ের কবি হিসেবে জানে, তখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যশোর-খুলনার এই ঐতিহাসিক আত্মীয়তার গল্প তাদের কাছে নতুন আগ্রহ তৈরি করতে পারে। কারণ ইতিহাসের এই বন্ধন কেবল অতীত নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ।
তথ্যসূত্র
১. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় — রবীন্দ্রজীবনী
২. ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল
৩. রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রবন্ধ
৪. দক্ষিণডিহি ও নরেন্দ্রপুরের স্থানীয় ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা
৫. শিলাইদহ কুঠিবাড়ি বিষয়ক ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণা