বর্ষবরণের মহড়ায় প্রাণবন্ত যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে রাজধানী ঢাকার পর দেশের অন্যতম বৃহৎ আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে আবারও প্রস্তুত হচ্ছে যশোর। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে শহরজুড়ে চলছে উৎসবমুখর প্রস্তুতি। নান্দনিকতা, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণবন্ত প্রতিযোগিতা, যা পুরো শহরকে করে তুলেছে উৎসবের নগরী।

সংস্কৃতিপাড়ায় এখন ব্যস্ততার চিত্র চোখে পড়ার মতো। শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে তৈরি করছেন ব্যানার, ফেস্টুন, মুখোশ, আলপনা ও শোভাযাত্রার বিভিন্ন উপকরণ। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও উন্মুক্ত স্থানগুলো নতুন সাজে সজ্জিত করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। চারদিকে যেন উৎসবের আগাম আবহ।

যশোরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। প্রায় চার দশক আগে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে শুরু হওয়া এ আয়োজন ধীরে ধীরে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। পরবর্তীতে চারুপীঠ, সুরবিতান, বিবর্তন ও সুরধুনীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন যুক্ত হওয়ায় এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ঢাকার পর সবচেয়ে বড় নববর্ষ শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় যশোরেই।

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খাঁন বিপ্লব জানান, বরাবরের মতো পৌর উদ্যানে এবারও অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণের মূল আয়োজন। সকালে ও বিকেলে দুই দফায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে, যেখানে সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও দেশাত্মবোধক পরিবেশনা স্থান পাবে। তিনি জানান, ১৩৮৪ বঙ্গাব্দে প্রথম উদ্যোগটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাহত হলেও পরের বছর সীমিত পরিসরে আয়োজিত অনুষ্ঠান ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর থেকেই যশোর পৌর উদ্যানকে কেন্দ্র করে বর্ষবরণের ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠে।

দেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনাকারী সংগঠন চারুপীঠ এবারও আয়োজন করছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। রঙিন ফেস্টুন, নান্দনিক মুখোশ ও প্রতীকী উপস্থাপনার মাধ্যমে এতে ফুটে উঠবে গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক সামাজিক বার্তা। চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও ভাস্কর মাহবুব জামাল শামীম জানান, শোভাযাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।

সুরবিতান সংগীত একাডেমি টাউন হল মাঠের শতাব্দী বটতলায় তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট বাসুদেব বিশ্বাস জানান, ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন এখন শহরের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।

এছাড়া বিবর্তন ও সুরধুনী আয়োজন করবে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে থাকবে গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও নাট্য পরিবেশনা। তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণ এ আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।

পাশাপাশি চাঁদের হাট, স্পন্দন, তির্যক, তরঙ্গ শিল্পীগোষ্ঠী, যশোর সাহিত্য পরিষদ, যশোর সাহিত্য কেন্দ্র ও বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন কবিতা পাঠ, পথনাটক, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও শিশু-কিশোরদের জন্য বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

নববর্ষ উপলক্ষে যশোর জেলা প্রশাসন বের করবে সম্মিলিত শোভাযাত্রা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার জানান, এসব আয়োজনকে ঘিরে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে ৮ এপ্রিল বুধবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রস্তুতি সভার আয়োজন করা হয়েছে।

এবারের বর্ষবরণে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান আয়োজকরা। শহরতলিতে গরুর গাড়ি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে, যা নতুন প্রজন্মকে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে সহায়ক হবে।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সেবার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম।

সব মিলিয়ে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নান্দনিকতা ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে যশোর আবারও নিজেকে প্রমাণ করতে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও বর্ণাঢ্য বর্ষবরণ কেন্দ্র হিসেবে।