সরকারি দামের বাইরে এলপিজি, যশোরে ক্রেতা ও বিক্রেতারা উভয়েই চাপে

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরে এলপিজি গ্যাসের বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে খুচরা বাজারে সেই দামে গ্যাস মিলছে না। বরং নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ ভোক্তারা যেমন চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন জটিল এক সংকটে।

চলতি এপ্রিল মাসে ভোক্তা পর্যায়ে বেসরকারি খাতের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এর দাম প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি সিলিন্ডারের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১,৭২৮ টাকা। অথচ মাত্র এক মাস আগে এর দাম ছিল ১,৩৪১ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজির সিলিন্ডারে এক মাসেই দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত বৃহস্পতিবার এই নতুন মূল্য ঘোষণা করে, যা একই দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়।

এর আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১,৩৫৬ টাকা। পরে আমদানি শুল্ক কমানোর ফলে ২৪ ফেব্রুয়ারি দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১,৩৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা ও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। উপশহরের জামরুলতলা বাজারের এক খুচরা ব্যবসায়ী জানান, ডিলার পর্যায় থেকেই তারা নির্ধারিত দামে গ্যাস পাচ্ছেন না। যমুনা গ্যাস ডিলার পর্যায়ে প্রায় ১,৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, ফলে খুচরা পর্যায়ে তা ১,৯৫০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। একইভাবে ওমেরা সহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বসুন্ধরা গ্যাস বাজারে প্রায় অপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে, আর যা পাওয়া যাচ্ছে তা ২,০৫০ থেকে ২,১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

যশোর শহরের বকুলতলা এলাকার কাদের এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদুল কবীর অর্নব বলেন, ডিলার পর্যায় থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। মূল্য নির্ধারণের পর থেকেই আমরা মারাত্মক সংকটে রয়েছি।

একই ধরনের অভিযোগ করেন শিমু এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় প্রতিনিধি। তিনি বলেন, এলপিজি গ্যাস ব্যবসা এখন আমাদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকরা আমাদের ভুল বুঝছেন, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা নিজেরাই বেশি দামে গ্যাস কিনছি।

এদিকে যশোরের পরিচিত এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোনালী এন্টারপ্রাইজ ও ফিরোজ এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বশীল কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, সরকার নির্ধারিত দামে ডিও করা হলেও তা তাদের কাছে পৌঁছাতে সিলিন্ডারপ্রতি অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬০ টাকা খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে ভোক্তারা এই পরিস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। যশোর শহরের গৃহিনী রাশেদা খাতুন বলেন, প্রতি মাসে গ্যাস কিনতে এখন কয়েকশ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। সংসারের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে গেছে।
আরেক ভোক্তা মাহবুব আলম বলেন, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না। এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে।

একজন দিনমজুর আব্দুল করিম বলেন, আমাদের আয় বাড়ে না, কিন্তু খরচ বাড়তেই থাকে। গ্যাসের এই বাড়তি দামে আমাদের মতো মানুষের জীবন চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এভাবে দাম বাড়তে থাকলে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন তারা।

সাধারণ মানুষের মতে, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং তদারকির অভাবের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজার দামের এই বড় ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, এলপিজির মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তব বাজার পরিস্থিতির মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী, উভয় পক্ষই চাপে পড়েছেন। দ্রুত কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে আনা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।