যশোরে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে ‘হাম’ টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত শিশুরা

0

বি এম আসাদ ॥ যশোরে সংক্রামক ভাইরাস ‘হাম’ বা মিজেলসের প্রাদুর্ভাব হঠাৎ করেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে ৮৯ জন রোগী প্যাথলজি পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন, যার মধ্যে ২১ জনের শরীরে সরাসরি ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

সবচেয়ে ভীতিপ্রদ তথ্য হলো, আক্রান্তদের একটি বড় অংশই ৯ মাস বয়সের নিচে, অর্থাৎ যারা এখনো হামের প্রতিষেধক টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।

যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ৬ নম্বর কেবিনে এখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ৪ মাস বয়সী শিশু মাহিরা। যশোর সদরের কচুয়া গ্রামের তামিম হোসেনের এই কন্যাসন্তান গত রমজানেও ঠান্ডা-কাশিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েকদিন পরই তার শরীর প্রচণ্ড জ্বরে পুড়ে যেতে থাকে। গত ২৬ মার্চ তাকে পুনরায় হাসপাতালে আনা হলে পরীক্ষায় ‘মিজেলস ভাইরাস’ ধরা পড়ে।

মাহিরার মা হাবিবা খাতুন ও দাদি মনিরা বেগম জানান, একটি দুর্যোগ কাটতে না কাটতেই আরেকটি রোগ জেঁকে ধরায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুধু মাহিরাই নয়, সম্প্রতি আরও তিন শিশু একই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যশোর সদর উপজেলায় সর্বোচ্চ ১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া যশোর পৌর এলাকায় ৪ জন, মনিরামপুরে ৩ জন, বাঘারপাড়ায় ২ জন এবং চৌগাছায় ১ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, টিকার বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা ভাইরাসের কবলে পড়ছে।

এ বিষয়ে শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক আম্বিয়া পারভীন সাথী জানান, সম্প্রতি হামের প্রভাব অনেক বেড়েছে, যা আগে এমন ছিল না।

সোমবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডের মাত্র ২৪টি বেডের বিপরীতে ৭৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিল ধারণের জায়গা না থাকায় অর্ধেকের বেশি শিশুকে মেঝেতে নিজেদের বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন, ইপিআই বিভাগে হামের টিকার কোনো সংকট নেই।

দীর্ঘদিন সরকারের পক্ষ থেকে হাম-রুবেলা বিশেষ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকাকেই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক মো. হোসাইন শাফায়াত বলেন, এ বছর হামে আক্রান্তের সংখ্যা গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। মূলত বড় ধরনের টিকাদান কর্মসূচি না থাকায় ভাইরাসটি পুনরায় মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা হামের ভয়াবহতা উল্লেখ করে বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস। আক্রান্ত শিশুকে অবশ্যই অন্যদের থেকে পৃথক রেখে চিকিৎসা দিতে হয়, অন্যথায় মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে। আগে নিয়মিত হাম-রুবেলা কর্মসূচি পালন করা হতো, যা কয়েক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা কমেছে এবং অনেকেই টিকা নিতে অনীহা দেখাচ্ছে। এই অসচেতনতাই প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির মূল কারণ।