নিরাপত্তার কড়াকড়িতে বন্ধ যশোর কালেক্টরেট চত্বরের দুয়ার

0

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ যশোর শহরের সেক্রেড হার্ট স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী সারাফ। মা স্মৃতি মনির সঙ্গে যশোর কালেক্টরেট পুকুরের রঙিন মাছের খেলা দেখতে মঙ্গলবার দুপুরে এসেছিল সে। কিন্তু চত্বরে প্রবেশ করতে পারেনি স্মৃতি মনি ও শিশু সারাফ।

জেলা কালেক্টরেট চত্বরে প্রবেশের প্রধান ফটকটি বন্ধ ছিল। সেখানে দায়িত্বরত ছিলেন ৪-৫ জন নিরাপত্তাকর্মী। ভেতরে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করেই তারা প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে মা-মেয়েকে ফিরিয়ে দেন। শুধু সারাফ নয়, তার মতো অনেক শিশুসহ নানা বয়সের মানুষ, যারা প্রয়োজন বা অপ্রয়োজনে কালেক্টরেট ভবন দেখতে, পুকুরপাড়ে বিশ্রাম নিতে কিংবা লাইব্রেরিতে বই পড়তে আসতেন, তাদের কাউকেই এখন ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

নিরাপত্তার অজুহাতে বর্তমানে যশোর কালেক্টরেট চত্বরে প্রবেশ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা সেখানে চাকরি করেন, কেবল তারাই অবাধে ঢুকতে পারছেন। তবে সেটেলমেন্ট অফিস বা জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে কাজ নিয়ে আসা সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। এতদিন এসব এলাকায় কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।

দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে আসা মানুষ শহরের কাজ শেষে একটু অবসরের জন্য এই পুকুরপাড়ে বসতেন, দুপুরের খাবার খেতেন কিংবা বিকেলের নাস্তা করতেন। সোমবার থেকে তাদের সবার জন্যই প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া শহরের জ্যাম এড়াতে যারা এই চত্বরটিকে ‘শর্টকাট’ পথ হিসেবে ব্যবহার করে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাতায়াত করতেন, তাদেরও এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, পশ্চিম দিকের মূল প্রবেশপথটি বন্ধ করে কড়াকড়ি ও জিজ্ঞাসাবাদ চললেও দক্ষিণ পাশের জজকোর্ট গেট, তথ্য অফিসের দুই পাশের দুটি পকেট গেট এবং মসজিদের সামনের গেট দিয়ে যে কেউ অনায়াসেই প্রবেশ করতে পারছে। ফলে মূল গেটে কড়াকড়ির যে উদ্দেশ্য, তা অন্য গেটগুলোতে কার্যকর না হওয়ায় ভেতরের ভিড় খুব একটা কমছে না।

যশোরের সাবেক জেলা প্রশাসক মহিবুল হক থেকে শুরু করে তমিজুল ইসলাম খান, সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলাম পর্যন্ত সকলেই এই চত্বরটিকে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তারা পুকুরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, চায়ের স্টল এবং পাঠাগার স্থাপন করেছিলেন।

লক্ষ্য ছিল, দর্শনার্থীরা এখানে এসে বই পড়ে, রঙিন মাছ দেখে কিংবা নৌকায় ভ্রমণ করে সময় কাটাবেন এবং শিশুদের কলতানে মুখরিত থাকবে এই প্রাঙ্গণ। কিন্তু হঠাৎ করেই গত ১২ জানুয়ারি থেকে বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান সর্বসাধারণের প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেছেন।

জানা গেছে, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে নিরাপত্তার স্বার্থেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে চত্বরটি শিশু-বৃদ্ধদের পদভারে ও হাসি-আনন্দে মুখরিত থাকতো, সেখানে এখন সাধারণের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ।

মঙ্গলবার দুপুরে গ্রাম থেকে আসা এইচএসসি উত্তীর্ণ সোনিয়া ও পিয়া খাতুন পুকুরপাড়ে গিয়েছিলেন। মসজিদের গেট দিয়ে ঢুকতে পারলেও পশ্চিম পাশের মূল ফটক দিয়ে বের হওয়ার সময় তারা বিপত্তিতে পড়েন। দায়িত্বরত কর্মীরা গেট খুলছিলেন না এবং তাদের নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করা হয়।

একইভাবে আটকে যান যশোর সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের দুই ছাত্রী অপরাজিতা সরকার ও নদী বৈরাগী। কাজ শেষে তথ্য অফিসের পাশের গেট দিয়ে ঢুকে পশ্চিম পাশ দিয়ে বের হতে চাইলে তাদের বাধা দেওয়া হয় এবং যে পথে এসেছেন সেই পথেই ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এমনকি সেটেলমেন্ট অফিসে কাজ থাকা সত্ত্বেও আতাউর রহমান ও হেলাল হোসেনকে প্রথমে বাধা দেওয়া হয়; পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের প্রবেশের অনুমতি মেলে।

এ সময় ফিরে যাওয়ার পথে কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন জেলা প্রশাসক এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছেন, আর অন্যজন নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তা বন্ধ করছেন।’ তাদের মতে, এর ফলে জনগণের ভোগান্তি কেবল বাড়ছেই।

দায়িত্বরত কর্মচারী কামাল হোসেনসহ অন্যরা জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশেই তারা এই জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। তারা স্বীকার করেন যে, অভ্যাসবশত মানুষ এখানে আসায় সমস্যা হচ্ছে, তবে বারবার উত্তর দিতে গিয়ে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারা কেবল অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন।

এ সময় আরও জানা যায়, গত সোমবার কয়েক দফা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পুকুরপাড়ে অবস্থানের দায়ে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে।

গত রোববার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে নিরাপত্তা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে কালেক্টরেট ভবন ও নির্বাচন অফিস সংলগ্ন এলাকায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের নির্দেশ দেন। এরপর গত তিন দিনে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।