লোকসমাজ ডেস্ক॥ কমপক্ষে এক মাস আগে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে আনার খুনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু হয়। এতে জড়িত অন্তত তিন জন ঘটনার ১৩ দিন আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতের কলকাতায় যান। তারও আগে যান দুজন। আনোয়ারুলকে হত্যার জন্যই সেখানে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়। এমপি আনারের বন্ধু ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ভাই আক্তারুজ্জামান শাহিনের পরিকল্পনায় পাঁচ কোটি টাকার চুক্তিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এবং হত্যার পর মরদেহ টুকরো করে মশলা মাখিয়ে ব্যাগে ভরে গুম করা হয়েছে। বুহস্পতিবার একাধিক মাধ্যম থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
খুনিদের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে ১৩ মে রাতে খুন করা হয় আনোয়ারুলকে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, স্বর্ণ চোরাচালানের আন্তর্দেশীয় চক্রের দ্বন্দ্বের জেরে পরিকল্পিতভাবে আনোয়ারুলকে ভারতে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মো. আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহিন নামের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কলকাতার নিউ টাউনে যে ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি এই আক্তারুজ্জামানের ভাড়া করা। তিনি ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র মো. সহিদুজ্জামানের ছোট ভাই।
কলকাতার পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিউ টাউনের ওই ফ্ল্যাট (ট্রিপলেক্স) নাজিয়া বানু নামের এক নারীর কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিলেন মো. আক্তারুজ্জামান। নাজিয়ার স্বামী সন্দ্বীপ রায় ওই ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিক। তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আবগারি দপ্তরের কর্মকর্তা। গত ২৫ এপ্রিল ফ্ল্যাট ভাড়ার চুক্তিপত্র সইয়ের পর ৩০ এপ্রিল আক্তারুজ্জামানকে ফ্ল্যাটটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এ তথ্য নাজিয়া কলকাতার নিউ টাউন থানা পুলিশকে দিয়েছে।
আক্তারুজ্জামানকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ খুঁজছে। তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তিনি গত সোমবার ঢাকা থেকে একটি ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে কাঠমান্ডু চলে গেছেন।
এ ঘটনার তদন্তে নেমে বাংলাদেশ ও কলকাতার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন তথ্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দুই দেশের তদন্তকারীদের মধ্যে তথ্য বিনিময় হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ইতিমধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে; যারা ঘটনার পর ভারত থেকে দেশে ফিরেছিলেন। ঢাকায় ডিবির সূত্র জানায়, গ্রেফতার তিনজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করছেন যে তারা সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে হত্যায় সরাসরি জড়িত।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডিসহ আন্তর্দেশীয় বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার তথ্য রয়েছে। দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকা- সংঘটিত হয় বলে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন।
এ ছাড়া আনোয়ারুল ভারতে গিয়ে যে বন্ধুর বাসায় উঠেছিলেন, সেই গোপাল বিশ্বাসও স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে জানা গেছে। আবার, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলের বিরুদ্ধেও চোরাচালানসহ অন্তত ২১টি মামলা ছিল। যদিও পরে সেসব মামলা থেকে তিনি খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোল রেড নোটিশও জারি করেছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে সেটা তুলে নেওয়া হয়।
পুলিশ জানতে পারে, আক্তারুজ্জামান ও আনোয়ারুল আজীম পুরানো বন্ধু। আক্তারুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। ঢাকায় গুলশানে আক্তারুজ্জামানের বাসা রয়েছে। তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব রয়েছে। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে তার বাসা।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কলকাতার ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার সময় আক্তারুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিলেন; যা ভাড়ার চুক্তিপত্রেও উল্লেখ আছে।
পাঁচ কোটি টাকার চুক্তিতে হত্যা
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার জন্য ঘাতকদের সঙ্গে পাঁচ কোটি টাকার চুক্তি করেছিলেন এই হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী। সে অনুযায়ী আনোয়ারুল ১২ মে কলকাতা যাওয়ার পরদিনই তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশে গ্রেফতার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানা গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই হত্যাকান্ডে জড়িত অভিযোগে বাংলাদেশে সৈয়দ আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল, শিলাস্তি রহমান ও ফয়সাল আলী ওরফে সাজি নামে তিনজনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মো. আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহিনের নাম এসেছে।
ঢাকা ও কলকাতার পুলিশ জানায়, আনোয়ারুল আজীম ১৩ মে দুপুরে গোপাল বিশ্বাসের বাসা থেকে বেরিয়ে কলকাতার নিউ টাউনের সঞ্জিভা গার্ডেনসের একটি ফ্ল্যাটে যান। সেখানেই হত্যা করা হয় তাঁকে। তাঁর নিখোঁজের ঘটনায় ১৮ মে কলকাতার বরাহনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন গোপাল বিশ্বাস। নিখোঁজের তদন্ত করতে গিয়ে কলকাতার পুলিশ তথ্য পায়, ওই ফ্ল্যাটে সৈয়দ আমানুল্লাহ ও শিলাস্তি রহমান নামের এক নারীও ছিলেন। এই তথ্যের সূত্র ধরে এই দুজনকে গ্রেফতার করে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ। পরে ফয়সাল আলী ওরফে সাজি নামে আরও এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের পুলিশ এই হত্যাকান্ডের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে। এর মধ্যে খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সৈয়দ আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল। তার গ্রামের বাড়ি খুলনার ফুলতলার দামোদর ইউনিয়নে। তিনি একসময় চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আমানুল্লাহ পরিচয়দানকারী ব্যক্তি পুলিশকে জানিয়েছেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলকে খুনের জন্য আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনের সঙ্গে তার পাঁচ কোটি টাকার চুক্তি হয়।
সূত্র বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমানুল্লাহ নামধারী ব্যক্তি এ কথা জানিয়েছেন। পরে আমানুল্লাহ ভাড়া করেন মোস্তাফিজুর রহমান ফকির ও ফয়সাল আলীকে। এই দুজনের বাড়ি খুলনার ফুলতলায়। এই ঘটনায় জিহাদ ও সিয়াম নামের আরও দুজনের নাম এসেছে। সিয়াম এর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।
কলকাতার নিউ টাউনে যে ফ্ল্যাটে সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে সেখানে সবার আগে তারা উঠেছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ৩০ এপ্রিল আমানুল্লাহ ও শিলাস্তি নামের এক নারীকে নিয়ে সেখানে যান আক্তারুজ্জামান। ঘটনার ছক কষে আক্তারুজ্জামান ১০ মে বাংলাদেশে চলে আসেন। অন্যরা ফ্ল্যাটে থেকে যান।
খুনের পর ১৫ মে শিলাস্তি ও আমানুল্লাহ আকাশপথে ঢাকায় চলে আসেন। ১৭ মে ঢাকায় আসেন মোস্তাফিজুর, পরদিন ফেরেন ফয়সাল। জিহাদের অবস্থান এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
নৃশংস হত্যা
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি জানান, এমপি আনারকে হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য হাড়-মাংস আলাদা করে মসলা মিশিয়ে ব্যাগে ভরা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি।
হারুন অর রশীদ বলেন, এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যার পরিকল্পনা হয় দুই থেকে তিন মাস আগে। ঢাকায় পুলিশের নজরদারির কারণে হত্যার স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয় কলকাতাকে। হত্যাকারীরা এমনভাবে এমপি আনারের লাশ গুমের চেষ্টা করেছে যাতে কোনো হদিস না মেলে। লাশ গুমের জন্য হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করে পৃথক পৃথক ট্রলিতে করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মাংস নিয়ে যাওয়ার সময় যাতে কেউ আটকালেও বুঝতে না পারে, সে জন্য মাংসের সঙ্গে মসলা মিশিয়ে খাবার উপযোগী মাংসের মতো বানানো হয়।
তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের কাজ চলছে। তবে তার মরদেহ পুরোপুরি না মিললেও অংশ বিশেষ পাওয়া যাবে।
পরিকল্পনা ঢাকায়, বাস্তবায়ন কলকাতায়’
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়ে বাংলাদেশেই। ঢাকার দুটি বাসায় দুই-তিন মাস আগে থেকেই এই পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে কলকাতায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ মে) বিকেল ৩টার দিকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
হারুন অর রশীদ বলেন, আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার পরিকল্পনা হয় দুই থেকে তিন মাস আগে। ঢাকায় পুলিশের নজরদারির কারণে হত্যার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কলকাতাকে। রাজধানীর দুটি বাসায় এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
তিনি বলেন, বিদেশের মাটিতে অপরাধ করলে বাংলাদেশ পুলিশের নজরে আসবে না বলেই অপরাধীরা কলকাতা বেছে নেয়। তবে তারা এ হত্যাকান্ডের পর পালিয়ে থাকতে পারেনি। আমরা তিনজকে গ্রেফতার করেছি। আরও কয়েকজনকে নজরাদিতে রাখা হয়েছে। হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী আনোয়ারুল আজীম আনারের বন্ধু আখতারুজ্জামান শাহীন। বাস্তবায়ন করে আমান উল্লাহ, তবে তার আসল নাম শিমুল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। ১৬ মে থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ২২ মে তাকে খুন করার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। গত ১৩ মে নিউ টাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে খুন করা হয় আনারকে। প্রথমে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। এরপর সেই বডি টুকরো টুকরো করা হয়। তিন দিন ধরে বডির পার্ট সরানো হয়। ১৪, ১৫ ও ১৮ মে বডির পার্ট সরানো হয়।





