নিম্নমানের বীজে ফলন কমেছে পেঁয়াজের, দামও কম

0

মফিজুল ইসলাম, শৈলকুপা(ঝিনাইদহ)॥ চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলায় পেঁয়াজের দামের বিপর্যয় হয়েছে। উপজেলার লাঙ্গলবাঁধ বাজার, শিতালী বাজার, হাটফাজিলপুর, রয়েড়া, ভাটই, গাড়াগঞ্জ, শেখপাড়া ও শৈলকুপা থানা সদরসহ বিভিন্ন হাটে বর্তমানে প্রতিমণ পেঁয়াজ ৬শ’ থেকে ৭শ’৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কুশরাড়িয়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষি আব্দুল আজিজ খান জানান, এবার প্রতি বিঘা জমিতে ২০ থেকে ২৫ মণ করে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ১ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয় অথচ এবার ১ বিঘা জমির পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। একে তো ফলন নেই, তারপর আবার বাজারে দাম কম। অনেক কৃষক সমিতি থেকে লোন নিয়ে পেঁয়াজ চাষাবাদ করেছিলেন। সে টাকা উঠছে না।
অন্যতম অর্থকরী ফসল হওয়ায় চাষিরা পেঁয়াজ চাষ বেশি করে থাকেন। এই ফসল মাঠ থেকে সংগ্রহের পর বেশি দামের আশায় চাষিরা মজুদ রেখে সুবিধামত সময়ে বিক্রি করেন। আবার কেউ কেউ অল্প অল্প করে বাজারে এনে বিক্রি করে তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটান। পেঁয়াজ চাষের গুরুত্ব চাষিদের কাছে সব সময়ই বেশি। তাই ক্ষুদ্র চাষিরা বিভিন্ন সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করে থাকেন। সরেজমিন উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে পেঁয়াজ উঠানোর ধুম পড়ে গেছে। পেঁয়াজ চাষিরা পেঁয়াজ উঠানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ বছর নিম্নমানের ভারতীয় পেঁয়াজ চারার কারণে ফলন একেবারেই কম হয়েছে। পেঁয়াজ ঠিকমত বাড়তে পারেনি। পেঁয়াজ উঠালেই দেখা যাচ্ছে শেকড় আর শেকড়। তবে কিছু কিছু জমির পেঁয়াজ বেশ ভাল হয়েছে। উপজেলার পেঁয়াজ অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে মনোহরপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, বিজুলিয়া, নওয়াপাড়া, দামুকদিয়া ও মাধবপুর গ্রাম। ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নের ধাওড়া, বকদিয়া ও খাসবকদিয়া কুশবাড়িয়া গ্রাম । হাকিমপুর ইউনিয়নের হরিহরা, সাধুহাটি,ররিয়া গ্রাম,নিত্যানন্দনপুর ইউনিয়নের আশুরহাট,বাগুটিয়া,সাবাসপুর, বুড়ামারা ও বকশীপুর গ্রাম। দুধসর ইউনিয়নের ফলিয়া,নাকোইল,ভাটই, আবাইপুর ইউনিয়নের যুগনী ,বাগনী, মীনগ্রাম ,ব্যাসপুর ও রুপদহ গ্রাম। বগুড়া ইউনিয়নের শিতালী, দলিলপুর ও আওধা গ্রাম। দিগনগর ইউনিয়নের সিদ্দি, ইতালী,আগুনিয়াপাড়া, দেবতলা ও হারুনদিয়া গ্রাম। উমেদপুর ইউনিয়নের বারইপাড়া,ব্রাহিমপুর,রয়েড়া ও বিএলকে গ্রাম উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকায় কাঙ্খিত ফলন না হওয়ায় বেশির ভাগ চাষিকে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
উপজেলার খাসবকদিয়া গ্রামের কৃষক আয়ুব আলী বলেন, ৬০ শতক জমিতে লাল তীর কিং মনে করে পেঁয়াজ লাগিয়েছিলাম। এবার ভাল পেঁয়াজ হয়নি। ফলন একেবারেই কম হয়েছে । বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২৫ মণ পেঁয়াজ হতে পারে। আবার বাজারে দাম একেবারেই কম হওয়ায় চিন্তার মধ্যে আছি। লাল তীর কিং’র বীজ মনে করে ইন্ডিয়ান নিম্মমানের বীজের কারণে এমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। চিন্তায় এখন ঘুম হচ্ছে না। আওধা গ্রামের আরেক পেঁয়াজ চাষি সুজন বিশ্বাস বলেন, ১০০ শতক জমিতে পেঁয়াজ চাষ করি। অন্যান্য বছরে যেখানে বিঘা প্রতি ৬০-৭০ মণ পেঁয়াজ হত এবারে সেখানে ২৫ থেকে ৩০মণ পেঁয়াজ পাচ্ছি। তাও আবার বাজারে দাম একেবারেই কম। এখন আমি কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। বিজুলিয়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, সমিতি থেকে লোন নিয়ে কয়েক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। ভেবেছিলাম পেঁয়াজ বিক্রি করে লোন পরিশোধ করবো। কিন্তু এখন আর তা হলো না। কারণ এবার ফলন একেবারেই কম। আবার বাজারে দামও কম। আমরা অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
সাতগাছি গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, বাজারে ৮ মণ পেঁয়াজ নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু দাম ৭শ টাকা বলছে। এ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি করলে এবার খরচ উঠবেনা ।তবে পেঁয়াজের ফলন ভাল না হওয়ায় পেঁয়াজ চাষিরা লোকসানে পড়েছে বলেও জানান তিনি। ধাওড়া গ্রামের পেঁয়াজ চাষি শিক্ষক আজাদ খান জানান , শিক্ষকতার পাশাপাশি পেঁয়াজের চাষ করি ।তবে খরচের তুলনায় অর্ধেক ফলনও হয়নি। তাও বাজারে দাম কম। কি করব বুঝতে পারছিনা।
এ ব্যপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিসউজ্জামান খান বলেন, এবার উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ৮ হাজার ১শ ৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছেন কৃষকরা। যার উৎপাদন ১লাখ৫৯ হাজার ৭শ৫ টন ছাড়িয়ে যাবে। তবে পেঁয়াজ চাষে ফলন বিপর্যয় হয়নি বলে আমার মনে হয়। এদিকে বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের দাম কম হলেও ২-৩ মাস সংরক্ষণ করতে পারলে পেঁয়াজের দাম বাড়ার সম্ভাবনা আছে।