উপকূলে সিত্রাংয়ের আঘাত

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ গতকাল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত করে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অংশ দিয়ে সিত্রাং বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সময় যত যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড়টি তত শক্তি অর্জন করছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের মূল ভাগ আজ ( সোমবার) রাত ১২টায় বাংলাদেশে আঘাত হানবে। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা নাগাদ এটি বাংলাদেশ অতিক্রম করবে।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এছাড়া খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, ঝালকাঠি, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর ও নোয়াখালী এবং ওই এলাকার দ্বীপ ও চরগুলোকেও ৭ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর ও কক্সবাজার উপকূল এবং সেখানকার চর ও দ্বীপগুলোকে ৬ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়ের সময় অমাবশ্যা থাকায় জোয়ারের উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে আট ফুট পর্যন্ত উঁচুতে উঠতে পারে। এ কারণে দেশের উপকূলের বেশির ভাগ এলাকা ওই জোয়ারে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এর সঙ্গে ভারী বৃষ্টি যুক্ত হওয়ায় দেশের উপকূলের সব কটি জেলায় স্বল্পস্থায়ী বন্যা হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় দেশের উপকূলের ১৫ জেলার নদীবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে গতকাল বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি ও উপকূলে আতঙ্ক তৈরি হয়।
খুলনা ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা খুলনায় দমকা বাতাসের সঙ্গে মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিনিয়র আবহাওয়াবিদ মো. আমিরুল আজাদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে খুলনা অঞ্চলে রোববার দুপুর থেকেই আকাশ মেঘলাসহ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। রাত ১২টার পর থেকে দমকা বাতাসের সঙ্গে মাঝারি আকারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
তিনি জানান, রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দুপুর ১২টার পর থেকে বৃষ্টিপাত আরো বাড়ে।
এদিকে, খুলনা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি এড়াতে খুলনা জেলার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫০ জনের জন্য ৪০৯টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টারের মধ্যে সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ উপজেলায় ১১৮টি, কয়রা উপজেলায় ১১৭টি, বটিয়াঘাটা উপজেলায় ২৭ টি, ডুমুরিয়া উপজেলায় ২৫ টি, পাইকগাছা উপজেলায় ৩২ টি, তেরখাদা উপজেলায় ২২ টি, রূপসা উপজেলায় ৩৯ টি, ফুলতলা উপজেলায় ১৩ টি ও দিঘলিয়া উপজেলায় ১৬টি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
অপরদিকে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’ এর প্রভাবে খুলনার কয়রা উপজেলার হরিণখোলা ও গাতিরঘেরী নামক স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সোমবার ভোরে হঠাৎ করে কয়রার কপোতাক্ষ নদের তীরের হরিণখোলা বেড়িবাঁধ ও শিবসা নদীর তীরে গাতিরঘেরী বেড়িবাঁধে ধস শুরু হয়। এতে ফসল, ঘরবাড়ি সব নোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ঘিরে আতঙ্ক বিরাজ করছে উপকূলীয় অঞ্চলে। ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের তীরে বসবাসকারীদের মাঝে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ভর করেছে।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, হরিণখোলা বেড়িবাঁধে মারাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে।
খুলনার কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম শফিকুল ইসলাম বলেন, কয়রার হরিণখোলা ও গাতিরঘেরীর বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের নিয়ে মেরামতের কাজের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া কয়রায় হোগলা, দোশহালিয়া, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, ঘাটাখালী, গাববুনিয়ার, আংটিহারা, ৪ নং কয়রা সুতির গেট ও মঠবাড়ির পবনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে । প্রত্যেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের বলা হয়েছে স্ব স্ব এলাকার বাঁধের দিকে খেয়াল রাখার জন্য। সাইক্লোন শেল্টারগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
কয়রা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসানুল বান্না জানান, ঘূর্ণিঝড় মঙ্গলবার ভোরের দিকে উপকূলে আঘাত হানতে পারে। সোমবার ভোর থেকে কয়রায় ৩০/৩৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মধ্যরাত থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় রিপোর্ট প্রদানে সমস্যা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় বেড়িবাঁধ রয়েছে মোট ১ হাজার ৯১০ কিলোমিটার। ষাটের দশকে মাটি দিয়ে তৈরি এই বেড়িবাঁধ ছিল ১৪ ফুট উঁচু ও ১৪ ফুট চওড়া। এখন এই ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের উচ্চতা ও চওড়ার অর্ধেকও অবশিষ্ট নেই। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের পরিমাপ আরও বেশি।
খুলনার জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জরুরি শুকনা খাবার প্রস্তুত রাখা, সাইক্লোন শেল্টারে যারা আসবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আগতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার জন্য কাজ চলছে।
তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিশেষ কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাদের যাতে নিরাপদে সরিয়ে নেয়া যায়-সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বাগেরহাট সংবাদদাতা জানান, ঝূর্ণিঝড় সিত্রাং-এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে মুশলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টির সাথে হালকা এবং মাঝারি ধরণের দমকা হাওয়াও রয়েছে। সময় বাড়ার সাথে সাথে এই বৃষ্টি ও বাতাসের গতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে ঝড়ের সময় যত এগিয়ে আসছে উপকূলবাসীর আতঙ্ক তত বাড়ছে। স্থানীয়রা প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রয়োজনীয় মালামাল গুছিয়ে আশ্রয়ন কেন্দ্রে যাওয়ার। শরণখোলা উপজেলার খুড়িয়াখালী আব্বাস তালুকদার বলেন, রবিবার সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বৃষ্টি রাতে মুশুল ধারায় নেমেছে। এখনও নিরবিচ্ছিন্ন বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড়ের সময় কি হবে জানিনা। মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহর বুনিয়া এলাকার হাফিজুর রহমান বলেন, সিত্রাং যদি সিডরের মত রূপ নেয় তাহলে আমরা খুব বিপদে পড়ে যাব। নদী বেষ্টিত আমাদের এই ইউনিয়নকে ঝড় জলচ্ছাস থেকে রক্ষার জন্য কোন বাঁধও নেই। জলচ্ছাস হলে, অনেক জান মালের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। শুধু আব্বাস ও হাফিজুর নয়, বাগেরহাটের বেশির ভাগ এলাকার মানুষের শঙ্কা এটি। তবে সিত্রাং মোকাবেলায় সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, আমাদের ৩৪৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। নির্দেশনা পাওয়া মাত্রই ঝূকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের আশ্রয়ন কেন্দ্রে নেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া ২৯৮ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলেই সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিতরণের নির্দেশনা দেয়া হবে। এদিকে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে সাবধান থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন মোংলার স্টাফ অফিসার (অপারেশন) লে. কমান্ডার মো. মহিউদ্দিন জামান। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগর ও বিভিন্ন নদ-নদীতে থাকা নৌযানগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাসিন্দাদের স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। যদি ঘূনিণঝড় আমাদের এলাকায় আঘাত হানে তাহলে তাদেরকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র অথবা কোস্টগার্ডের বেজ ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং-এ রূপ নিয়েছে। ক্রমশ এটির শক্তি বাড়ছে। ফলে সব সমুদ্রবন্দরগুলোকে চার নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা জানান, সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, ঘূর্ণিঝড়টি নিম্মচাপে পরিণত হয়েছে। ২৫ তারিখ সকালে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত আনতে পারে। এবং নদীতে ৫ হতে ৮ ফিট জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এ সব সংবাদে উপকূলীয় মানুষের মাঝে ভয় ও আতংক সৃষ্টি হয়েছে। শ্যামনগর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন জানান,২০০ কিলোমিটার পাউবো’র বেড়িবাঁধের মধ্যে ২০টি পয়েন্ট ঝুকিপূর্ণ।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম জানান, পাউবো’র বেড়িবাঁধের অবস্থা ভালো না। ঘূর্ণিঝড়ে নদীতে জলোচ্ছাস হলে গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনীসহ কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হতে পারে। এ জানমালসহ চিংড়ি ঘের ঢুবে কয়েক কোটি টাকার মাছ ভেসে যাবে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আকতার হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় আগম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলীয় মানুষদের নিরাপদে নেয়ার জন্য ১০৩টি সাইক্লোন সেন্টার স্কুল, মাদ্রাসাসহ ২০০ টি আশ্রয়ন কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।