ঝিনাইদহে উপজেলা নির্বাচন অফিসে কর্মচারীর টাকা নেয়ার ভিডিও চিত্র নিয়ে আলোচনা

0

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহ ॥ চরম হয়রানি ও অনিয়মের পাশাপাশি অধঃস্তন কর্মচারীদের ঘুষ লেনদেনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিস। জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কাজে গেলেই হতে হয় ভোগান্তির শিকার। স্মার্টকার্ড নিতে গেলে সকালে স্লিপ জমা নিয়ে বিকেল তিনটার পর ডেলিভারি দেওয়া হয়। এতে দূর-দূরান্তের ভোটাররা চরম ভোগান্তির শিকার হন। অফিসের কর্মচারীদের রুঢ় ব্যবহারে মানুষ অতিষ্ঠ বলে অভিযোগ। ইউপি নির্বাচনের দোহায় দিয়ে কর্মকর্তারা জরুরি কাজগুলো আটকে দেন। ফলে বছরের পর বছর ঘুরে মানুষ প্রতিকার পাচ্ছে না। নাম সংশোধনীর বিভিন্ন ক্যাটাগরির শত শত ফাইল তদন্তের অভাবে ঝুলে আছে। এমনও আছে যে, ২০১৭ সালে নাম সংশোধনী করতে দিয়ে এখনো ভোটারদের ঘুরিয়ে ভোগান্তি দিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচন অফিসের কর্তাব্যক্তিরা। দ্রুত প্রতিকার চাইতে গেলে দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়।
এদিকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বারইখালী গ্রামের আব্বাস আলীর ছেলে আল মামুন নতুন ভোটার হতে গিয়ে ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এই ঘুষ নেন উপজেলা নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক রোকনুজ্জামান রকি। বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার অফিসে হুলস্থুল পড়ে যায়। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গিয়ে চাউর হয়ে যায়। আল মামুন ঘুষের টাকা ফেরৎ চেয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল ছালেকের কাছে ধর্ণা দেন। এ নিয়ে গোটা অফিসে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ উঠেছে, রোকনুজ্জামান রকি উপজেলা নির্বাচন অফিসার মশিউর রহমানের খুব প্রিয় পাত্র। রকির দিয়ে তিনি জটিল ও কঠিন কাজগুলো সমাধান করেন। রকি উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে ভোটারদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করেন। সদর উপজেলার বারইখালী গ্রামের আল মামুন জানান, তিনি দুই মাস আগে নতুন ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু তার ছবি তোলা হচ্ছিল না। বুধবার অফিস সহায়ক রোকনুজ্জামান রকির কাছে টাকা দিলে ছবি তোলার এসএমএস যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে ৫ হাজার টাকা দেয়ার পর তার ছবি তুলে দিতে রাজি হন রকি। এদিকে টাকা দেওয়ার আগে নোটগুলোর ছবি ও টাকা দেওয়ার ভিডিও ধারণ করেন আল মামুন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা নির্বাচন অফিসারের কাছে রকির অবৈধ লেনদেনের বিষয়ে অভিযোগ দিলে পকেট চেক (তল্লাশি) করা হয় রকির। এসময় আল মামুনের ছবির টাকার নম্বরের সাথে রকির পকেটে থাকা টাকার নম্বর মিলে যায়। টাকা লেনদেনের ভিডিও গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে পৌঁছালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। নতুন চাকরি পাওয়ার পর থেকে রকি এভাবে টাকা হাতিয়ে নিলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কথিত আছে, এই টাকার ভাগ পান উপজেলা নির্বাচন অফিসার মশিউর রহমান। জাতীয় পরিচয় পত্র সংশোধন, হারানো বা স্থানান্তরের আবেদন মানেই টাকা। চাহিদামতো টাকা না দিলে হয়রানি হতে হয়। ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়া শাপলা চত্বরের মাসুদ অটোর মালিক মাসুদের ছেলে ভোটার স্থান পরিবর্তনের আবেদন করেন ৮ মাস আগে। অবশেষে তিনি নির্বাচন অফিসের রকির সাথে চুক্তি করে সফলতা পান। বিনিময়ে উপজেলা নির্বাচন অফিসার মশিউর রহমানকে একটি হেলমেট দেওয়া হয়। রকির বিষয়ে উপজেলা নির্বাচন অফিসার মশিউর রহমান বলেন, ফাঁদে ফেলে একটি চক্র রকিকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। ফ্রি হেলমেট নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেই হেলমেট নিয়ে এসেছি। কিন্তু এই বাবদ নয়। টাকা দেওয়ার কথা আমার মনে ছিল না। এখন তারা কথা ঘুরাচ্ছে।’ জেলা নির্বাচন অফিসার আব্দুল ছালেক জানিয়েছেন, অফিস সহায়ক রোকনুজ্জামান রকির বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উপজেলা নির্বাচন অফিসারের বিরুদ্ধে কারও অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানালে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সরেজমিন ঝিনাইদহ সদর উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত।’ অথচ কথিত আছে, সদ্যসমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীরা পচ্ছন্দের প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।