খুলনায় রেলের জমিতে দখলদারদের দাপট : নেতাদের ভোট ব্যাংকের বস্তিতে অবাধ মাদক ব্যবসা ও শর্ত ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ

এহতেশামুল হক শাওন, খুলনা॥ খুলনায় রেলওয়ের জমিতে অবৈধ দখলদাররা বস্তি বানিয়ে ভাড়া দিচ্ছেন। আবার বৈধ লিজ গ্রহিতারা শর্ত ভেঙে নির্মাণ করেছেন পাকা স্থাপনা। এ অবস্থা চলছে দশকের পর দশক। একাধিকবার দখলদারদের তালিকা করে উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। ভূ-সম্পত্তি শাখার তথ্য অনুযায়ী খুলনা রেলের মোট জমির পরিমাণ ১৯৫ দশমিক ৪৪ একর। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে ১০ একর, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৬ দশমিক ৪২ একর, জেলা প্রশাসন ২ দশমিক ৮৭ একর, জলাশয় হিসেবে ১৩ দশমিক ৮৭ একরসহ মোট ৩৩ দশমিক ৫ একর জমি ব্যবহার হচ্ছে। বাকি ১৬২ দশমিক ৩৯ একর জমি রেলের ব্যবহৃত এলাকা। ওই এলাকার প্রায় ৬০ একর জমি অবৈধ দখলে চলে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খুলনায় পাওয়ার হাউজ মোড় এলাকায় আধুনিক রেল স্টেশন উদ্বোধনের পর ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পুরানো স্টেশন পরিত্যক্ত হতে বসেছে। এই স্টেশনের বড় বাজার সংলগ্ন রেল লাইনের অনেক অংশে অবৈধ দখলদাররা নানা স্থাপনা বানিয়ে দখল করছেন। মাটি ফেলে, বেড়া তুলে, মালপত্র রেখে শুরু হয়েছে দখল প্রক্রিয়া। নিউ মার্কেটের বিপরীত পাশ থেকে ভৈরব নদের পাড় হয়ে ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এবং জোড়াগেট পাইকারি কাঁচা বাজার এলাকা পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি বিশালাকৃতির বস্তি। এখানে বসবাসরতরা স্বীকার করেছেন, রেলের কাছ থেকে কোন বরাদ্দ নেওয়া নেই। এখানকার বস্তিতে ৮ থেকে ১০ হাজার ভোটারের বসবাস। যখন যারা শাসন ক্ষমতায় থাকেন, এই্ সব বস্তিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভোট ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বস্তিগুলো উচ্ছেদ অভিযান থেকে রক্ষা করেন। বাসিন্দাদের কল্যাণে খুলনা সিটি কর্পোরেশন বস্তিগুলোর ভেতরে পাকা রাস্তা বানিয়ে দিয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন বানিয়েছে। সুপেয় পানির জন্য ডিপটিউবওয়েল বসিয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, ট্রেন যোগে ভারত থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের মাদক, ওষুধ, চিনি, জিরা, কাপড়, কসমেটিক্স, মশলাসহ অন্যান্য পণ্য প্রথমে এই বস্তি এলাকায় খালাস ও মজুদ করা হয়। এরপর চাহিদা অনুযায়ী ছড়িয়ে পড়ে মহানগরীসহ জেলার নানা প্রান্তে। এখানে প্রতি মাসে কোটি টাকার কারবার চলে। যার লাভের অংশ পৌঁছে যায় রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রেলের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মচারীসহ বিভিন্ন দপ্তরে।
রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি শাখা সূত্রে জানা গেছে, অব্যবহৃত জমি চারটি ক্যাটাগরিতে একসনা লিজ দেওয়া হয়- বাণিজ্যিক, কৃষি, নার্সারী ও জলাশয়। এরমধ্যে বাণিজ্যিক ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ নেওয়া জমিতে কোনভাবেই পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কাঁচা অথবা সেমি পাকা ঘর বানিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে হবে। খুলনা রেল স্টেশন থেকে ফুলবাড়িগেট পর্যন্ত সীমিত কয়েকটি আধা পাঁকা দোকান দেখা যায়। বাকি সমস্ত লিজগ্রহিতাই ছাদ ঢালাই দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, অনেক স্থানেই গোটা একটা মার্কেট নির্মাণ হয়েছে। রয়েছে নামিদামি ব্র্যান্ডের পণ্যের শো-রুম। আবার নিচতলায় দোকান, দোতলায় কোচিং সেন্টার আর তৃতীয় তলায় বাসাবাড়িও রয়েছে প্রচুর। জোড়াগেট, জংশন, আলমনগর, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে, বৈকালী, মুজগুন্নি, গোয়ালখালি, নতুন রাস্তা, বিএল কলেজ, দৌলতপুর, রেলিগেট, ফুলবাড়িগেট, ইস্টার্ণ গেট- সর্বত্র একই চিত্র। যা রেলের জমি লিজ গ্রহণ আইনের সুষ্পষ্ট লংঘন। খুলনা রেল স্টেশন থেকে ইস্টার্ণ গেট এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২১ শ’ লিজ গ্রহিতা রয়েছে, যাদের শতকরা ৮০ ভাগ আইন ভেঙে পাকা স্থাপনা করেছেন। যশোর অভিমুখী খুলনা রেল লাইনের বেশির ভাগ অংশ মহাসড়কের গা-ঘেষে চলে গেছে। এইসব জমির বর্তমান বাজার মূল্য বেড়ে গেছে অস্বাভাবিক হারে। ব্যক্তি মালিকের কাছ থেকে কোন শো-রুম বা দোকানের জন্য একটি দোকান ভাড়া নিতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা জামানত গুনতে হতো। অথচ রেলের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে সেই জমি বরাদ্দ মিলছে।
ভূ-সম্পত্তি শাখা সূত্র জানিয়েছে, রেলের জমির বাণিজ্যিক খাজনার হার খুলনা স্টেশন এলাকায় প্রতি বর্গফুট ৭০ টাকা, জংশন, বিএল কলেজ ও দৌলতপুর স্টেশন এলাকায় ৪৫ টাকা এবং শিরোমনি এলাকায় মাত্র ১৫ টাকা। পানির দরে জমি বরাদ্দ নিয়ে লিজগ্রহিতারা রীতিমতো আইন লংঘনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। চলমান সময়ে উল্লিখিত স্থানসমূহে অন্তত ২৫ টি নতুন বহুতল পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে রেলের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে অজ¯্র অনিয়মের ঘটনা ঘটে চললেও চোখ বন্ধ করে রাখছেন। রেলের নিরাপত্তা শাখার কয়েকজন কর্মচারী মসোহারা আদায় ও সমঝোতার দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে। আদায়কৃত অর্থের সিংহভাগ অংশ পৌঁছে যায় ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে।
রেলের জমি অবৈধ দখলে থাকার অভিযোগ স্বীকার করে ভূ-সম্পত্তি শাখার কানুনগো মোনায়ারুল ইসলাম বলেন, সাবেক স্টেশন চত্বর, ঘাট এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে সীমানা চিহ্নিত করে ফেন্সিং (ঘেরাবেড়া) দেওয়া হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কাজও বন্ধ করা হয়েছে। আগে লিজগ্রহিতারা নগদ টাকা জমা দিয়ে বরাদ্দ নবায়ন করতেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক ড্রাফট সিস্টেম চালু করেছি। ফলে আর্থিক দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। আমি দায়িত্ব নিয়ে পূর্ববর্তী অর্থ বছরে ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছিলাম। আমার প্রথম বছরে সোয়া ৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। পরের বার করোনার কারণে আদায় কমলেও তা ছিল পৌনে ৮ কোটি টাকা। অবৈধ দখলদালদের তালিকা করে কয়েক দফা উচ্ছেদ নোটিশ করেছি। কিন্ত জনবল সংকটসহ নানা কারণে অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। নানা মহলের চাপ থাকে স্বীকার করে তিনি বলেন, আশা করছি আসন্ন নভেম্বর মাসে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চলবে। রেলওয়ের ডিভিশনাল এস্টেট অফিসার মো.নুরুজ্জামান বলেন, রেলের জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, কিংবা আইন লংঘন করে পাকা স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ শুধু খুলনার নয়, সারা দেশের চিত্র এক। দশকের পর দশক এ অবস্থা চলছে। রেলের জমি অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে আমাদের আন্তরিকতা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে অনেক কাজ করতে পারি না। তাছাড়া মানবিক দিক বিবেচনার দাবি ওঠে। প্রভাবশালীরা বস্তিবাসীদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেন। খুলনায় রেলের ডিভিশনাল অফিস হবে, হাসপাতাল নির্মাণ হবে। তখন জমির প্রয়োজন পড়বে। অবৈধ বস্তি উঠে যাবে।

ভাগ