বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন ভাবনা

প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান ॥বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সব আলোচনায় একটি কথা বলার চেষ্টা করেছি, এর মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞানের সৃষ্টি ও বিতরণ। এর ওপর নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। যে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা তথা জ্ঞান সৃষ্টিতে যত বেশি অগ্রসর সে দেশ তত উন্নত। যেসব দেশকে আমরা উন্নত বলি; সেগুলোর দিকে তাকালে এই চিত্রই দেখা যাবে। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ওই সব দেশে। সবচেয়ে উন্নত দেশে সবচেয়ে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। যে দেশে যত বেশি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সে দেশ জ্ঞানবিজ্ঞানেও তত সমৃদ্ধ। আমরা নিজেদের দেশকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন ছাড়া পথ নেই।
মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি আমরা। এ স্বপ্ন পূরণে দেশের শিক্ষা ও গবেষণার মান অনেক বাড়াতে হবে। বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান সব ক্ষেত্রেই গবেষণা চাই। বিশেষ করে প্রযুক্তি হাসিল হয় এমন ক্ষেত্রগুলোতে গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। সে জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার ধারায় নিয়ে আসতে হবে। আরঅ্যান্ডডিতে (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট) পিছিয়ে থাকার কারণগুলো ইতঃপূর্বে বলার চেষ্টা করেছি। বলেছি, আমাদের মেধার সঙ্কট নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মান অনেক ভালো। এ মান আরো ভালো করার সুযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ উন্নত করতে আর্থিক অনুদান বৃদ্ধি, প্রণোদনার ব্যবস্থা, মানসম্মত গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি আমরা। আর্থিক টানাপড়েন নিয়ে কারো পক্ষে গবেষণায় মনযোগী হওয়া খুবই কঠিন। আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের অনুদানে চলে বিধায় সরকারকেই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া শিক্ষকরা গবেষণায় মনযোগী হবেন কিভাবে? তাদের বিদেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। অর্জনের জন্য পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তাহলে তাদের মধ্যে গবেষণার ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি হবে। তখনই দেশ প্রকৃত উন্নয়নের পথে যাত্রা শুরু করবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো থাকলে ভালো হতো। তাদের আরো বেশি উৎপাদনশীল করতে চাইলে এটি জরুরি। বর্তমান বেতনকাঠামো প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগের সাথে মিল রেখে করা। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে। প্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডারের ক্ষেত্রে বেতন কাঠামো একই থাকার পরও কাজের প্রয়োজনে অন্যান্য সুবিধা দেয়া হয়। তাই শিক্ষকরা যাতে গবেষণায় মন দিতে পারেন সে জন্য তাদেরও প্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে সরকারি যে দু’টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রয়েছে সেখানেও গবেষণা করতে গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তাহলে শিক্ষকরা গবেষণা করতে চাইলে তারা কেন সেই সুবিধা পাবেন না? সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনুষদের বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা কিছুটা কম থাকে। বেশি থাকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে। একটি উন্নতমানের ল্যাব তৈরি করতে মাত্র ১৫-২০ কোটি টাকা দরকার। কিন্তু এই খরচটুকু করলে সেখান থেকে যে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি বেরিয়ে আসবে তা অনেক বেশি লাভজনক হবে। আমাদের সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাত্র দু’টি- অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন ও সাইন্স ল্যাব। এর বাইরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালকেন্দ্রিক গবেষণাগার রয়েছে। দেশকে উন্নত করতে চাইলে গবেষণাগার বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে গবেষণার একটি বড় অংশ হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সেখানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার প্রতিযোগিতা চলে। গবেষণার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্থিক সহায়তা দেয়। তা ছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে বিশাল এনডাওমেন্ট ফান্ড।
প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপেও গবেষণা চলে। কলাররেটিভ রিসার্চ হয়। এসব গবেষণা থেকে যে প্রযুক্তি আসে সেটি দেশের কল্যাণে কাজে লাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হলে সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া ছাড়া উপায় নেই। সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করলেই চলবে না, সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষকও লাগবে। শিক্ষার্থীরা তখনই গবেষণা করতে পারবে যখন তারা মেধাবী শিক্ষকের সাহচর্য পাবে। এটা ঠিক যে, এখনো আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেধার ভিত্তিতে ছাত্র ভর্তির ধারা ধরে রাখতে পেরেছে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা নিরপেক্ষভাবে নেয়া হয়। সত্যিকারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেখানে সুযোগ পায়। এটা নিয়ে কখনো বিতর্ক হয়েছে বলে শুনিনি। যারা ভর্তি হতে পারে না তারা আসলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। তাই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলকভাবে মেধাবীদের বেছে নিচ্ছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এ চর্চা থাকা উচিত। শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও রাজশাহী বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা সঙ্গত কারণেই বেশি প্রাজ্ঞ হয়ে থাকেন। সেগুলোর পরিসরগত সুবিধাও বেশি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি ও আধুনিক সুবিধা পায়; কিন্তু সেখানে শিক্ষকরা অভিজ্ঞতায় কিছুটা কম। আমাদের আরেকটি সমস্যা হলো- রাজধানীর বাইরে গিয়ে থাকতে না চাওয়ার প্রবণতা। ব্যক্তিগতভাবে জানি, ঢাকার বাইরের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ঢাকায় থাকেন। এখান থেকে গিয়ে ক্লাস নেন বা অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এমনকি ঢাকার খুব কাছের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও ক্যাম্পাসে থাকেন না। থাকলেও খুবই স্বল্প সময়ের জন্য। এভাবে গবেষণায় মনোনিবেশ করা সম্ভব নয়। গবেষণা করতে শিক্ষকের ক্যাম্পাসে থাকা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণার ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের সুযোগ-সুবিধা কিভাবে বাড়ানো যায় তা ইতঃপূর্বের লেখায় বলেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষকরা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে গবেষণা করতে যান। এতে সবেতন ছুটি মঞ্জুর করা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো আর্থিক অবদান থাকে না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিজেই স্কলারশিপ জোগাড় করেন। যারা জোগাড় করতে পারেন তারা যেতে পারেন। অন্য দিকে, বেশি মেধাবী হওয়ার পরও স্কলারশিপ জোগাড় করতে না পারলে তার পক্ষে বিদেশে গিয়ে গবেষণা বা পিএইচডি করা সম্ভব হয় না। এমন শিক্ষকদের স্কলারশিপ দিয়ে গবেষণার জন্য বিদেশে পাঠানো উচিত। যে দেশে পাঠানো হবে সে দেশের মান অনুযায়ী স্কলারশিপ হতে হবে। ব্যবস্থাটি সরকারকেই করতে হবে। দেশের উন্নতির জন্য এটা দরকার। এতে দেশ থেকে মেধা পাচারের প্রবণতা বা শিক্ষকদের বিদেশে গিয়ে থেকে যাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। বর্তমান সরকারের আমলে সা¤প্রতিক সময়ে এমন কিছু স্কলারশিপ দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এর পরিমাণ ও আওতা বাড়াতে হবে। বৈচিত্র্য আনতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেরা ছাত্রদের সুযোগ দানের যে ঐতিহ্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছিল সেটি ধরে রাখা যায়নি। গবেষণাক্ষেত্রের দৈন্যদশার জন্য এটাও কম দায়ী নয়। গত ২০ বছরে শিক্ষক নিয়োগের চিত্র ও পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি সহজেই পরিষ্কার হবে। সবচেয়ে ভালো ছাত্ররা শিক্ষক হতে না পারলে তারা অন্য পেশায় চলে যাবে। এটাই স্বাভাবিক। এর পেছনে রয়েছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব।
১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে যে স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে সেটি পাকিস্তান আমলে ছিল না। এই অধ্যাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এতটাই স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, এখানকার শিক্ষকরা যেকোনো ইস্যুতে কথা বলতে পারেন, যেকোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে পারেন। তাদের চাকরির স্থায়িত্ব অনেক বেশি। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের অতিরিক্ত স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির পেছনে কিছুটা কাজ করেছে বলে মনে হয়। তাই আমরা একে সংস্কার করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আনার পক্ষে। তাহলে সেখানে মেধার লালন হবে। আর আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার সত্যিকারের সুফলগুলো আরো বেশি করে পেতে থাকব। নিয়োগ, পদোন্নতিসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখন দলীয়করণের প্রভাব লক্ষ করা যায়। যারা কোনো দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন তারা নিয়োগ পাচ্ছেন, বেশি পদোন্নতি পাচ্ছেন। একজন শিক্ষক কোনো একটি রাজনৈতিক মতবাদ সমর্থন করতেই পারেন। কোনো দলের প্রতি দুর্বলতা থাকতে পারে। কিন্তু সেটি যখন তার শিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে অথবা অন্য শিক্ষকের স্বার্থহানি ঘটানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন সেটি অবশ্যই বর্জনীয়। দেশের উন্নয়ন চাইলে মেধাবী শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। সবচেয়ে ভালো ছাত্রের কাছ থেকে যা পাওয়া যাবে সেটা অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীর কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। সুবিধা দেয়া হলো, বিদেশ থেকে পিএইচডি করিয়ে আনা হলো কিন্তু শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে টপ স্কোরারকে সুযোগ দেয়া হলো না, তাহলে কোনো লাভ হবে না।
দলীয়করণ বিভিন্ন রকম হয়। কিন্তু এটা যখন কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে সেটি হয় সবচেয়ে ক্ষতিকর। দলীয় রাজনীতির লাগাম টানতে নির্বাচনকেন্দ্রিকতা কমাতে হবে। নির্বাচন থাকবে কিন্তু সেখানে সিনিয়র টিচারদের প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে। তবে এটা ঠিক, বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেটসহ অন্য যেসব নির্বাচন হয়; তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক পরিচ্ছন্ন এবং অনন্য। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া শিক্ষকদের নির্বাচনে মোটামুটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করে। শিক্ষকদের নির্বাচনের ফল নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ থাকে না। এটা দেশের রাজনীতিকদের জন্য শিক্ষণীয়ও বটে। এমন কোনো শিক্ষক নির্বাচন হয়নি যেখানে কারচুপি বা জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দলও হেরেছে কিন্তু কারচুপির অভিযোগ কেউ তোলেননি। কিন্তু এখন সর্বক্ষেত্রে যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে সেটি ঠিক বলে মনে হয় না। শিক্ষক সমিতির নির্বাচন হতে পারে, সিন্ডিকেট নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু ডিন নির্বাচন কেন প্রয়োজন তা বুঝে আসে না। ডিন নিতান্তই একাডেমিক পদ। বিশ্বের যেকোনো দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন মানে খুবই সম্মানজনক পদ। ডিন হতে পারে বিভাগীয় প্রধানের পদের মতো পর্যায়ক্রমিক। শুধু প্রফেসরদেরই এ পদের জন্য মনোনীত করা যেতে পারে। আবার ডিন নির্বাচন যদি করতেই হয় তাহলে সেখানে শুধু প্রফেসরদের অংশগ্রহণ থাকতে পারে। ভোটার ও প্রার্থী উভয়েই হবেন প্রফেসর। জুনিয়র টিচারদের সেখানে যুক্ত করার দরকার নেই। কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে তাকে ভোটারদের হাতে রাখতে হয়। তখন আর নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা ধরে রাখা যায় না। সব ভোটার অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে খুশি রাখতে গিয়ে একজন প্রার্থীর পক্ষে যেভাবে নিজের কাজ করা উচিত ছিল সেভাবে কাজ করা সম্ভব হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট হচ্ছে সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। নিয়োগ কর্তৃপক্ষও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ জন সিন্ডিকেট সদস্যের মধ্যে সব মিলিয়ে ছয়জন শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে আসেন। কমিটির যেকোনো সিদ্ধান্তে তাদের মনোভাব প্রাধান্য পায়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যেসব শিক্ষক সিন্ডিকেট যান; তারা যে মনোভাব পোষণ করেন সেটিই সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। এতে শিক্ষক নিয়োগে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পাওয়ার শঙ্কা থাকে। সিন্ডিকেট সদস্যরা যে রাজনৈতিক দলের প্রতি দুর্বল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকে। সিলেকশন কমিটি বাছাই করে দিলেও সিন্ডিকেট যদি বলে এ তালিকা হবে না, তখন নতুন করে প্রার্থী বাছাই করতে হয় কমিটিকে। শিক্ষকদের পদোন্নতির বেলায়ও এ কথা সত্য। আমাদের জানা মতে, সময়মতো পদোন্নতি না পেয়ে হতাশ হয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক বিদেশে চলে গেছেন। তারা থাকলে দেশ অনেক উপকৃত হতো। দলীয় নির্বাচনের বাইরে গিয়ে সিন্ডিকেটে শিক্ষক প্রতিনিধিরা স্থান পেলে সেখানে অধিকতর ন্যায্যতা পাওয়া সম্ভব। তাই এ ধরনের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন তা মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। এখন সিন্ডিকেট লেকচারার থেকে প্রভোস্ট পর্যন্ত আলাদাভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। এভাবে আলাদা না করে সবাইকে শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। লেকচারার পদের বিপরীতে নির্বাচিত ব্যক্তি শুধু লেকচারারদের পক্ষে কথা বলবেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের বিপরীতে নির্বাচিত ব্যক্তি শুধু তাদের পক্ষে কথা বলবেন… এমন ধারণা ঠিক মনে করি না। এখানে শুধু ফুল প্রফেসরদের নির্বাচিত করা যেতে পারে। নির্বাচন থাকবে। পক্ষ-বিপক্ষও থাকবে। প্রার্থী হবেন শুধু প্রফেসররা। ভোট দেবেন সবাই কিন্তু নির্বাচিত হবেন শুধু প্রফেসররা। একজন লেকচারারও একসময় প্রফেসর হবেন। সিন্ডিকেটে নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন।
আসলে আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে নতুন চিন্তার আলোকে ঢেলে সাজাতে বলছি। ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রেও এ বিবেচনা প্রযোজ্য। সরকার পছন্দসই ব্যক্তিকে ভিসি করুক, তাতে আপত্তি নেই; কিন্তু মেধাবীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাহলে তারা মেধাকেই লালন করবেন। যারা ভিসি হয়েছেন তারা মেধাবী নন, এটা বলছি না, কিন্তু অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যারা ভিসি হওয়ার যোগ্য, তারা যেন বঞ্চিত না হন। এ ক্ষেত্রে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। শিক্ষকদের নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজের বাইরে এনে একাডেমিক কাজে যত বেশি সম্পৃক্ত করা যাবে আমাদের জন্য তত কল্যাণকর হবে। দেশ সমৃদ্ধ হবে, উন্নয়ন বেগবান হবে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং বাড়বে।
লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স এবং সাবেক ডিন ও অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভাগ