সরকারি প্রাথমিকে অনেক শিক্ষার্থী ই–ঈ উচ্চারণ পারে না, গণিত ও ইংরেজিতে বড় দুর্বলতা

0
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২,১০০টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে মিলেছে শিক্ষার করুণ চিত্র। অনেক শিক্ষার্থী বাংলা বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারছে না এবং গণিত ও ইংরেজিতে রয়েছে তীব্র দুর্বলতা।। ছবি: সংগৃহীত

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিশুশিক্ষার্থী বাংলা ভাষার কয়েকটি বর্ণ—ই, ঈ, উ, ঊ, স, শ এবং ঙ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারছে না। যুক্তবর্ণে তারা হোঁচট খায়। শিশুদের অনেকে ইংরেজিতে দুর্বল। গণিতে দুর্বলতাও চোখে পড়ার মতো।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে ঢাকা মহানগরে ৩৪১টি, ঢাকা জেলার প্রায় ৬০০, নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭ ও মুন্সিগঞ্জের ৬১১টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে এই চিত্র পেয়েছে। এই চার এলাকার মোট প্রায় ২ হাজার ১০০টি বিদ্যালয় পরিদর্শনের আওতায় এসেছে।

এতে দেখা গেছে, ২৫৪টি বিদ্যালয়ের পাঠ্যমান ‘এ’ শ্রেণির, অর্থাৎ খুব ভালো; শতকরা প্রায় ১২ শতাংশ। বাকিগুলো ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির, অর্থাৎ গড়পড়তা ভালো বা ভালো নয়। ‘বি’ শ্রেণিতে রয়েছে ১ হাজার ৯৫টি বিদ্যালয় (৫২%)। ‘সি’ শ্রেণিতে রয়েছে ৭৪৯টি বিদ্যালয় (৩৬%)। এর বাইরেও কয়েকটি জেলার কিছু বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়।

কোনো বিদ্যালয়ে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত শিখনদক্ষতা অর্জন করতে পারলে সেই বিদ্যালয়কে ‘এ’ শ্রেণিতে রাখা হয়। হারটি ৬১ থেকে ৭৯ শতাংশ হলে বিদ্যালয়কে ‘বি’ এবং ৬০ বা তার নিচে হলে ‘সি’ শ্রেণিতে রাখা হয়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষকের যেমন অভাব, তেমনটি শিক্ষকসংকটও প্রবল। অন্যান্য আর্থসামাজিক কারণও রয়েছে। শিক্ষাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরে পড়া, লেখা ও গণনার দক্ষতা দুর্বল থাকলে পরবর্তী শ্রেণিতে তার প্রভাব আরও প্রকট হয়, যা কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।

মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার মান বাড়াতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছে। এরই অংশ হিসেবে পরিস্থিতি বোঝার জন্য নতুন পরিদর্শন প্রতিবেদনটি করানো হয়েছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের পরিচালক মো. আবদুল হালিম ভূঞা বলেন, তাঁরা বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন এবং এখন এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি। এগুলোয় শিক্ষার্থী ২ কোটির ১ লাখের মতো। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৭টি। এগুলোয় শিক্ষার্থী ১ কোটি ৬ লাখের বেশি।

ঢাকা মহানগরে পরিদর্শন করা ৩৪১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৮টির শেখার মান (পাঠ্যমান) ‘এ’, ১৭৭টির ‘বি’ এবং ১১৬টি ‘সি’ শ্রেণির। এসব বিদ্যালয়ে বাংলায় দক্ষতা অর্জনের হার ৭১ শতাংশ। ইংরেজিতে ৬২ শতাংশ ও গণিতে ৬৩ শতাংশের দক্ষতা অর্জন হলেও অন্যদের তা হচ্ছে না। তিনটি বিষয় মিলিয়ে গড় বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের হার ৬৬ শতাংশ।

ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা জেলার অধীন সাভার, কেরানীগঞ্জ, দোহার, ধামরাই ও নবাবগঞ্জের প্রায় ৬০০ বিদ্যালয়ের বাংলায় দক্ষতা অর্জনের হার ৬৭ শতাংশ, ইংরেজিতে ৬০ শতাংশ ও গণিতে ৬২ শতাংশ। অন্যদের দক্ষতা অর্জন হচ্ছে না।

পরিদর্শনের আওতায় আসা নারায়ণগঞ্জের ৫৪৭টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় ৬২ শতাংশ, ইংরেজিতে ৫৭ শতাংশ ও গণিতে ৫৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন হচ্ছে। অন্যরা পিছিয়ে থাকছে। মুন্সিগঞ্জের ৬১১টি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় ৬৯ শতাংশ, ইংরেজিতে ৬৬ ও গণিতে ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে। অন্যরা পারছে না। এলাকাভেদে রমনা থানার চিত্র ভালো হলেও দোহারের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে।

পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক শিক্ষার্থী ‘ব্রহ্মপুত্র’ ও ‘তৃষ্ণা’-এর মতো যুক্তবর্ণযুক্ত শব্দ পড়তে পারে না। চার-পাঁচ বর্ণের বাংলা শব্দ পড়তেও সমস্যা হয়। পঞ্চম শ্রেণিতে একাধিক শব্দাংশযুক্ত শব্দ পড়ার দক্ষতা আরও দুর্বল। সাবলীল পাঠকের সংখ্যাও কম। প্রথম শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থী কারচিহ্ন নিয়ে সমস্যায় পড়ে। পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি বইয়ের নির্দেশনা কিংবা পরিচিত শব্দও পড়তে পারে না।

দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্থানীয় মান সম্পর্কে ধারণা দুর্বল। অনেক শিক্ষার্থী ছোট ছোট গুণ ও ভাগ করতে পারে না। হাতে রেখে বিয়োগ করার ক্ষেত্রেও অনেক বিদ্যালয়ে ভুল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ—চারটি মৌলিক প্রক্রিয়াতেই সমস্যা রয়েছে। নামতা আয়ত্তে থাকলেও ব্যবহারিক প্রয়োগ করতে পারে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছেলেশিক্ষার্থীরা মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ছেলেদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও কম। ঢাকা মহানগরের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম। কোনো কোনো শ্রেণিতে ক্লাসে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকে।

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রয়েছে, এমন কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কোচিং ব্যবসা রয়েছে। শিক্ষকদের নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার প্রবণতাও বেশি। অনেক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আলো নেই। সাত শতাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।

হাজারীবাগ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শেখ মোহাম্মদ ছায়িদ উল্লা বলেন, প্রতিটি শ্রেণিতে ৪–৫ জন শিক্ষার্থী খুবই দুর্বল। এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই নানা ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যায় আক্রান্ত। কারও মা–বাবা সঙ্গে থাকেন না, অনেকে আর্থিক সংকটে রয়েছে বা শিশুটি দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছে।

বর্তমানে ৩৬ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, যা মোট বিদ্যালয়ের ৫৫ শতাংশ। পদোন্নতি দিয়ে এসব পদ পূরণ করা হলে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৮ হাজারের বেশি। এখন সহকারী শিক্ষকের ১৪ হাজারের বেশি পদে নিয়োগ চূড়ান্ত হয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ বলেন, অনেক শিক্ষক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করেন, আবার বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতিও রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে কাঙ্ক্ষিত শেখা নিশ্চিত হচ্ছে না। আর শ্রেণি অনুযায়ী শিখনঘাটতি দূর না করায় ধাপে ধাপে তা বাড়তে থাকে।

প্রতিবেদনে বাংলা ও ইংরেজিতে সম্পূরক পাঠ্যসামগ্রী ব্যবহার, প্রতি মাসে ‘বর্ণ উৎসব’ আয়োজন, বর্ণ কার্ড ব্যবহার, যুক্তবর্ণ ভেঙে শেখানো, বাংলা বিষয়ে বাড়ির কাজ হিসেবে গল্পের বই পড়তে দেওয়া, গণিত ও ইংরেজি ক্লাস প্রথমে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ‘অ্যাবাকাস মডেলের’ মাধ্যমে স্থানীয় মান শেখানো, যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ বিষয়ে বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার, নিয়মিত নামতা অনুশীলন, গ্রুপভিত্তিক কার্যক্রম এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ের দু–তিনজন শিক্ষককে গণিত অলিম্পিয়াডভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।