সংশোধন হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন, গুজব ও অপপ্রচারে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল

0
পাসের তিন মাসের মাথায় ফের সংশোধন হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন। গুজব, অপতথ্য ও এআই প্রযুক্তির অপপ্রচারে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে আবারও ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন বেশ কয়েকটি ধারা যুক্ত করে আইনটিকে আরও কঠোর করার পাশাপাশি বাড়ানো হচ্ছে শাস্তির মেয়াদ ও অর্থদণ্ড।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই এই সংশোধিত আইনটি পাস হতে পারে।

আইনটির সংশোধিত খসড়ায় নতুন চারটি শব্দ—’গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ও ‘মানহানিকর তথ্য’—কে অপরাধের সংজ্ঞায় এনে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আইনটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ক্ষমতাপ্ত অন্য সংস্থাকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সূত্রের তথ্যমতে, সরাসরি নাম উল্লেখ না থাকলেও অন্য সংস্থা বলতে মূলত ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারকে (এনটিএমসি) বোঝানো হয়েছে।

সংশোধিত আইনে নতুন একটি ২৬/ক ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সাইবার পরিসরে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এমন অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ৪০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়ায় গুজবের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—এমন কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে বা করার ঝুঁকি থাকে। আর অপতথ্য বলতে এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানো হয়েছে, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রচার করা হয়।

আইনের ২৫ নম্বর ধারায় সংশোধন এনে মানহানি ও হেয়প্রতিপন্নের জন্য নতুন শাস্তির বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি অডিও, ভিডিও, স্থিরচিত্র, গ্রাফিক্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে নির্মিত কোনো বিকৃত তথ্য দিয়ে কারও মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করলে তাঁকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তবে কোনো নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সী কারো বিরুদ্ধে এই অপরাধ করা হলে সাজা বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা হবে। মানহানির ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন পেশার মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত গুজব ছড়িয়ে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। মূলত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া অডিও-ভিডিও বানিয়ে অপপ্রচার চালানো ঠেকাতেই শাস্তির বিধান কড়া করা হচ্ছে।

তবে আইনটির নতুন রূপ নিয়ে খোদ সরকারের ভেতরেই মিশ্র অবস্থান রয়েছে। এক পক্ষ সংশোধনের পক্ষে যুক্তি দিলেও অন্য পক্ষ মনে করছে, তড়িঘড়ি করে এই সংশোধন আনলে সরকারের কঠোর সমালোচনা হবে, আইনের অপপ্রয়োগ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপ আসবে।

আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ এই পরিবর্তনের চরম বিরোধিতা করছেন। তাঁদের মতে, গুজব ও অপতথ্য শব্দগুলোর সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট মানদণ্ড না থাকলে এই আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে হয়রানির সুযোগ তৈরি হবে।

প্রযুক্তি গবেষক ও ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশ আবারও আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যুগে ফিরে যাচ্ছে। এতে নিশ্চিতভাবে আইনের অপপ্রয়োগ ঘটবে এবং অনলাইন স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবনমন হবে, যা গণতন্ত্রের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপক বিরোধিতার মুখে তৈরি হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যা রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হয়েছিল। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার সেই আইনটি বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। পরে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল অধ্যাদেশটি বিল আকারে পাস করে ‘সাইবার সুরক্ষা বিল-২০২৬’ হিসেবে আইন করা হয়। সেই আইন চালুর মাত্র তিন মাসের মাথায় আবার এটি সংশোধনের মুখে পড়ল।