রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা মিয়ানমারে, সমাধানও মিয়ানমারে : প্রধানমন্ত্রী

0
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকটটির উৎপত্তি ও টেকসই সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত বলে সতর্ক করেন তিনি।। ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারে সংঘটিত দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৫ দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও মূলত মিয়ানমারেই নিহিত রয়েছে।

গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা সংকট’ বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রাখাইন রাজ্যের বর্তমান আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা এখনো নিজ দেশে নির্বিচারে আটক, অবাধ চলাচলে বিধি-নিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম, চরম নিরাপত্তাহীনতা ও নানামুখী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র সংগঠন ‘আরাকান আর্মি’—উভয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে রাখাইনে এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্বনেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখন আর কেবল সহমর্মিতা প্রকাশ করে বসে থাকার সময় নেই; বরং সংকটের মূল কারণগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে টেকসই সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির স্থায়ী অবসানের দিকে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।

মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, “মানবিক সহায়তার সংবেদনশীল উদারতা কখনোই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশ একা এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার দায়ভার বহন করে যাবে—এমনটাও আশা করা ঠিক নয়।”

বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত শরণার্থী অবস্থায় থাকুক; তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে এবং নিজেদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে পারে, বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে।

উচ্চপর্যায়ের উক্ত অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকট চিরতরে দূর করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন:

১. বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন: আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের সমন্বয়ে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা। একই সঙ্গে মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা আনতে বিশ্বনেতাদের নিজস্ব প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ গড়ে তোলা।

২. সহিংসতা বন্ধ ও অধিকার প্রদান: প্রবীণ ও শিশুসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা এবং নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আস্থা তৈরি করতে তাঁদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।

৩. পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা ও স্থানীয়দের সুরক্ষা: রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা বজায় রাখার পাশাপাশি আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সাহায্য অব্যাহত রাখা।

৪. বিচার ও কঠোর জবাবদিহি: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ভূমিকা স্মরণ করে মিয়ানমারে ঘটানো গুরুতর অপরাধের পেছনে দায়ীদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা।

৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন: অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ সব ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা।