লোকসমাজ ডেস্ক : ইসরায়েলের যুদ্ধ লেবাননের লাখো শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে বাস্তুচ্যুত করেছে। এতে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন করে গভীর সংকটে পড়েছে। অনলাইন শিক্ষা ও বিকল্প নানা কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী এখনও এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। হারানো শিক্ষাজীবন পুষিয়ে নিতে এখন বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়ে জোর দেওয়া হলেও নাগরিক শিক্ষা বা সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।
বহু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের দেশ লেবাননের জন্য এটি ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক কার্লোস নাফাহ আল জাজিরাকে বলেন, “একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো নাগরিক তৈরি করা।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা স্বীকার করতে চাই না যে, আমরা একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে ফেলেছি।”
২০২৬ সালের ১২ মে প্রকাশিত আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের যুদ্ধ লেবাননের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ‘হারানো প্রজন্ম’ তৈরি করছে। এতে সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে এবং জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের বহু স্কুল ধ্বংস করেছে এবং কয়েক লাখ শিক্ষার্থীকে বাস্তুচ্যুত করেছে। শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে এমনিতেই অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়েছে।

ইসরায়েল যুদ্ধ লেবাননে তৈরি হচ্ছে হারানো প্রজন্ম
লেবাননের বৈরুতে, বাস্তুচ্যুতদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি স্কুলের আঙিনায় শিশুরা খেলছে – রয়টার্স

অস্থায়ী সমাধানের চেষ্টা
গত ২ মার্চ ইসরায়েল দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননে যুদ্ধ তীব্র করে। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি হামলা চালানোর পর হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় লেবাননে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ স্কুলগামী শিশু রয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, তাদের পড়াশোনার স্কুলগুলোও এখন অনেক ক্ষেত্রে অচল বা অপ্রবেশযোগ্য হয়ে পড়েছে।
ইউনেস্কো জানিয়েছে, লেবাননের ৩৩৯টি স্কুল সরাসরি যুদ্ধাঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া আরও শত শত স্কুল বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হওয়ায় প্রায় আড়াই লাখ শিশুর শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। আরও ১০০টি স্কুল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকায় সেগুলোও শিগগিরই অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে। তবে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নআয়ের পরিবারের শিশুদের জন্য এই ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না। ২০১৯ সাল থেকে একের পর এক সংকটের কারণে লেবাননের শিক্ষাবর্ষ প্রায় প্রতি বছরই বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
আসফারি ইনস্টিটিউট ফর সিভিল সোসাইটি অ্যান্ড সিটিজেনশিপের জ্যেষ্ঠ গবেষক তালা আবদুলগানি আল জাজিরাকে বলেন, “২০১৯ সালের অক্টোবর বিপ্লব, করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট এবং এখনকার যুদ্ধ—সব মিলিয়ে হাইব্রিড শিক্ষা এখন লেবাননের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সীমিত ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ সংকট, ডিভাইসের অভাব এবং অনিশ্চিত জীবনযাপনের কারণে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনেস্কো যৌথভাবে বিভিন্ন অস্থায়ী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি স্কুলে একাধিক শিফট চালু করা, অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
ইউনেস্কোর জ্যেষ্ঠ শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ মাইসুন চেহাব বলেন, “শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জীবন, বন্ধু, রুটিন ও স্থিতিশীলতা হারাচ্ছে। তারা ভয়, উদ্বেগ, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং সহিংসতার মানসিক আঘাত বহন করছে।”
বাড়ছে বৈষম্য
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা সহায়তার চেষ্টা করছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
চেহাব বলেন, “দারিদ্র্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে। পরিবারগুলো এখন যাতায়াত, খাবার, গরমের ব্যবস্থা নাকি সন্তানের ইন্টারনেট সংযোগ—কোনটি বেছে নেবে, সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।”
তার মতে, এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঘটনা।
যুদ্ধ শুরুর আগেই লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রায় ভেঙে পড়েছে। লেবানিজ সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, আয় বৈষম্যের সূচক গিনি সহগ ২০১১ সালের ০.৩২ থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে ০.৬১ হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে লেবানন।
আবদুলগানি বলেন, “যুদ্ধের প্রভাব দেশের সব অঞ্চলে সমান নয়। এখন ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক অবস্থাই নির্ধারণ করছে কোনো শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে কি না।”
একের পর এক ধাক্কায় বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক সমাজও ভয়াবহ সংকটে পড়েছে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে।
আবদুলগানি বলেন, “আমরা এমন এক অসম শিক্ষা ব্যবস্থার জন্ম দেখছি, যেখানে কিছু শিশু নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে, আর অন্যরা দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে। তারা মানসিক আঘাত, শিক্ষার ক্ষতি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে রয়েছে।”
লেবাননের সরকারি শিক্ষকরা বহু বছর ধরে ন্যায্য বেতনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের বেতন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে অনেকে অতিরিক্ত আয়ের জন্য টিউশনি বা অন্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
চেহাব বলেন, “শিক্ষকরা যে কোনো শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। কিন্তু তারা ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছেন। ২০১৯ সালের পর থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষক দেশ ছেড়েছেন অথবা পেশা পরিবর্তন করেছেন।”
যুদ্ধে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে বহু শিক্ষকও রয়েছেন। অর্থনৈতিক দুর্ভোগের পাশাপাশি তাদের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে।

চেহাব বলেন, “একটি শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো একটি সংকট সামাল দিতে পারে। কিন্তু লেবাননে বছরের পর বছর ধরে একের পর এক সংকট আঘাত হেনে চলেছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি দক্ষ হলেও অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।
আবদুলগানি সতর্ক করে বলেন, “দ্রুত ও কার্যকর জাতীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে এবং পুরো একটি প্রজন্ম আরও পিছিয়ে পড়বে।”