যশোর শিক্ষা বোর্ড : আত্মস্বীকৃত অপরাধী আবদুস সালামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ধীরগতিতে চাপা ক্ষোভ

0

তহীদ মনি ॥ যশোর শিক্ষা বোর্ডের ৭ কোটির অধিক টাকা জালিয়াতির ঘটনায় আত্মস্বীকৃত অপরাধী আব্দুস সালামের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজুর মাসাধিকাল পেরিয়ে যাওয়ার পথে। এতদিনেও সে বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শেষ করতে পারেনি এবং তার ভবিষ্যত কী হবে সে বিষয়ে সুপারিশ করতে পারেনি। তবে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছেন, ঈদের আগেই বিষয়টি ফয়সালা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে যশোর শিক্ষা বোর্ডের কোটি কোটি টাকার চেক জালিয়াতি ধরা পড়ে, দফায় দফায় ধরা পড়ার পর জানা যায় ৩২ চেকে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে উঠিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র। এই চক্রের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত শিক্ষা বোর্ডের ওই সময়ের হিসাব সহকারী আব্দুস সালাম। প্রতিটি চেক জালিয়াতিতে তার অংশগ্রহণ সবাইকে হতবাক করে দেয়। এক পর্যায়ে আব্দুস সালাম আত্মগোপনে যায় এবং আত্মগোপন থেকেই সকল জালিয়াতির দায় নিজ কাঁধে নিয়ে বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখেন। একই সাথে তিনি প্রায় ১৬ লাখ টাকা ফেরত দেন। এর ১০ দিন পর আরো ১৫ লক্ষাধিক টাকা শিক্ষা বোর্ডর্কে ফেরত দেন। এমতাবস্থায় ওই বছর ১১ অক্টোবর আব্দুস সালামকে সাময়িক বরখাস্ত করে শিক্ষা বোর্ড। একই মাসে শিক্ষা বোর্ড জালিয়াতির ঘটনায় ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। মাসাধিককাল পর সে কমিটির তদন্ত রিপোর্টে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আব্দুস সালামের নাম উঠে আসে। এদিকে, একই মাসে যশোর শিক্ষা বোর্ড ঘটনার বিষয়ে যশোর দুর্নীতি কমিশনকে লিখিতভাবে জানায়। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পেয়ে ৫ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে। সে মামলার ৩নং আসামি ছিলেন মো. আব্দুস সালাম। প্রথম ও দ্বিতীয় আসামি ছিলেন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সচিব। যাদেরকে পরবর্তীতে ওএসডি করা হয়েছে।
এদিকে, ২০২১ সালের অক্টোবরে মো. আব্দুস সালামকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর এক পর্যায়ে সব কিছু স্তিমিত হয়ে যায়। অবশেষে চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় মামলা দায়ের করে। ২২ ফেব্রুয়ারি বিভাগীয় মামলা দায়েরের সাথে সাথে ১০ কার্য দিবস সময় দিয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়। এর প্রেক্ষিতে আব্দুস সালাম আরো সময় চেয়ে চলতি বছর ৬ মার্চ বোর্ডকে পত্র দেয় এবং বিভিন্ন জনকে অভিযুক্ত করে ও নিজেও সম্পৃক্ততার বিষয়ে একটি লিখিত জবাব দেয় বলে জানা যায়। চাকরি বিধি অনুযায়ী এসব বিশ্লেষণ করার জন্যে এবং চূড়ান্ত তদন্ত ও সুপারিশমালা প্রস্তুতের জন্যে ৩ সদস্যের বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক। অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন উপ কলেজ পরিদর্শক মদন কুমার দাস ও উপসচিব (প্রশাসন) মো. জাহাঙ্গীর আলম। ২৭ মার্চ থেকে এক নাগাড়ে ও কোনো যৌক্তিক কারণ ছ্ড়াাই মুলতবি বিহীনভাবে কমিটি তাদের তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চাকরি বিধিতে কমিটিকে বিরতিহীনভাবে তদন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে, তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কোনো সময়সীমা বিধিতে নেই। তারপরও অনেকদিন পার হয়ে গেলেও তদন্ত রিপোর্ট কেনো জমা হচ্ছে না বা আব্দুস সালামের বিষয়ে কেনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না এটা নিয়ে চাপা ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে বোর্ড কর্মচারীদের মধ্যে।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান প্রফেসর মাধব চন্দ্র রুদ্র বলেন, অভিযুক্ত যেনো কোনোভাবে ফাঁক-ফোকড় না পায়, আদালতে যেনো কোনো অবস্থাতেই বাড়তি সুযোগ না নিতে পারে এ জন্যে প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রেখে পুঙ্খানুপঙ্খ তদন্ত করা হচ্ছে। তবে খুব শিগগিরই বিষয়টি শেষ হবে।
শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মো. আব্দুল খালেক সরকার দেরির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, হয়তো কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সার্বিক বিষয়টি নিয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আহসান হাবিব জানান, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেরি, হলেও সঠিকভাবে যেনো কাজ হয় সে চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। শেষ হলে সুপারিশসহ বিষয়টি সম্পন্ন করে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে তদন্ত কমিটি। কমিটির সুপারিশ অনুসারে ঈদে অফিস বন্ধের আগেই হয়তো সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে।