যশোরের ঝিকরগাছায় এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কাশেম-রবির সন্ত্রাসী বাহিনী

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের ঝিকরগাছায় আতংকের নাম ‘কাশেম শিকদার ও রবি শিকদার’। দীর্ঘ ১৫ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে তারা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়নের সর্বত্র। যা এখনো চলমান রয়েছে।

তাদের অত্যাচারের সর্বোচ্চ শিকার হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থক। সাধারণ মানুষও রক্ষা পাননি এদের কবল থেকে। দুর্ধর্ষ কাশেম শিকদার ও রবি শিকদার সম্পর্কে আপন দুই ভাই। এর মধ্যে কাশেম বড়। তাদের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহি- নী। এই বাহিনী দিয়েই তারা বিএনপির নেতা-কর্মীদের জমি দখল, সালিশের নামে চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলা দায়েরসহ ব্যাপক অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছেন। পরিচয় কাশেম শিকদার নাভারণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি। তার ছোট ভাই রবি শিকদার একই ইউনিয়নের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি। তাদের বাড়ি ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারন ইউনিয়নের ডাংগী গ্রামে। পিতার নাম হাকিম শিকদার।

ক্ষমতার উৎস কাশেম ও রবির ক্ষমতার প্রধান উৎস ছিলেন ঝিকরগাছার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম। সাবেক এই চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় থেকে তারা গোটা নাভারণ ইউনিয়নকে সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিণত করেছেন। এদের বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করার সাহস কারো নেই।

কাশেম শিকদারের হাতিয়ার

কাশেম শিকদার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তার দুই ছেলে ইয়াছিন শিকদার ও ইমরান শিকদারকে। তার দুই ছেলেই শার্শার দক্ষিণ বুরুজবাগান গ্রামের তোজাম হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। এছাড়া তার ছোট ছেলে ইমরান শিকদার যশোর সরকারি পলিটেকনিক কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদারের অনুসারী। অত্যন্ত দুর্ধর্ষ হওয়ায় দুই ছেলেকে নানা অপকর্মে যুক্ত করেছেন কাশেম শিকদার।

সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য যারা

কাশেম ও রবির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনীর অন্যতম সদস্যদের পরিচয় মিলেছে। এরা হলেন-কাশেম শিকদারের মামা নানা অপরাধের হোতা রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের আবুল কালাম, একই গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে আলাল উদ্দিন, আজিজুল হক মন্টুর ছেলে মফিজুল, নাভারণ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি চারাতলা গ্রামের মৃত হারুনর রশিদের ছেলে যুবলীগ নেতা আলমগীর হোসেন ও কুন্দিপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে দুর্ধর্ষ নবাব বাহিনীর প্রধান নবাব। এরা সবাই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী।

কাশেম-রবির যত অপকর্ম

আওয়ামী লীগ নেতা কাশেম শিকদারের ইন্ধনে ২০১৮ সালে নাভারণ-সাতক্ষীরা মোড়ে এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর তার কাছ থেকে ৮০ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেন রবি শিকদার ও আলমগীর হোসেন। এ ঘটনায় রবি ও আলমগীর গংয়ের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন ওই ব্যবসায়ী।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রবি শিকদার ও আলমগীর কারাভোগও করেন। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কাশেম শিকদার ও তার ভাই রবি শিকদারের নেতৃত্বে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বিএনপি কর্মী রেজাউল ইসলামের ভিটে বাড়ির প্রায় ৫ শতক জমি জোরপূর্বক দখল করে দেয় আওয়ামী লীগ নেতা হায়দার আলীকে। রেজাউল ইসলাম নাভারণ ইউনিয়নের রঘুনাথপুর বাগ গ্রামের বাবর আলীর ছেলে। কাশেম ও রবি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই অপকর্মটি করেন। ২০১১ সালে জানুয়ারি মাসে একই গ্রামের দুদুর ছেলে মুজিবুর রহমানের দেড় লক্ষাধিক টাকার একটি পালসার মোটরসাইকেল জোর করে ছিনিয়ে নেয় কাশেম-রবি গং।

একই দিন পার্শ্ববর্তী শার্শা উপজেলার শার্শা ইউনিয়নের শান্তিপুর পাড়ার বিএনপি নেতা মহিউদ্দিন মহির কাছে সন্ত্রাসীদের পাঠিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা রবি শিকদার। কিন্তু চাঁদার টাকার দিতে অস্বীকার করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। পরে বিএনপি নে নেতা মহি ৫০ হাজার টাকা দিয়ে রক্ষা পান। ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে আওয়ামী নেতা কাশেম শিকদার ও রবি তার মামা আবুল কালামের ইন্ধনে দুর্ধর্ষ নবাব বাহিনীর প্রধান নবাব ও ডাকাত মফিজুল তাদের বাহিনী নিয়ে গভীর রাতে বিএনপির সমর্থক কৃষক চাঁদমিয়ার বাড়িতে হানা দেয়।

ওই রাতে চাঁদমিয়াকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বিনাকারণে তাকে পিস্তল দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেয়া হয় । এর কিছুদিন পর ডাঙ্গী গ্রামের ঘটক ঝাড়ু মিয়ার সাথে চাঁদ মিয়ার মিয় ছেলের তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। । অর্থচ এ ঘটনাকে পুজি করে দুদিন পর কাশেম, রবি ও তার মামা ডাঙ্গী গ্রামে এক সালিশ ডাকেন। অবাক বিষয়, এই সালিশ করতে কাশেম শিকদার ও রবি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান আলীসহ আওয়ামী লীগের প্রায় ২শ’ ক্যাডার নিয়ে ওই গ্রামে যান। সেদিনের সালিশে চাঁদ মিয়ার কাছ থেকে জরিমানার নামে ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন কাশেম-রবি গং।

চাঁদ মিয়ার অপরাধ ছিল তিনি বিএনপির একজন কট্টর সমর্থক। এদিকে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পরের দিন কাশেম শিকদারের ইন্ধনে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন পাস্তুর ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাকে গুদাম ঘরে আটকিয়ে লোহার বাটখারা দিয়ে আঘাত করে মুখ থেতলে দেয়া হয়। এছাড়া লোহার রড় দিয়ে বেদম মারপিট করলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে প্রাণ বাঁচাতে বিএনপি নেতা পাস্তু দীর্ঘদিন এলাকা ছাড়া ছিলেন। তিনি নাভারণ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

২০১৮ সালে রঘুনাথপুর ডাংগী গ্রামের আব্দুস সাত্তারের দুই ছেলে বিএনপি কর্মী আবু মুসা ও শাহিন হোসেনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা দেয়া হয়। একদিন গভীর রাতে কাশেম ও রবি তাদেরকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেন। এ মামলায় ওই দুই ভাইকে বেশ কিছুদিন কারাভোগ করতে হয়েছে।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে নাভারণ ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের বিএনপি নেতা রমিজ শিকদারের ৪ শতক ভিটে বাড়ির জমি দখল করে নেন কাশেম শিকদার। এতে রমিজ ও তার ছেলে বাধা দিলে কাশেম শিকদার ও দুই সন্ত্রাসী ছেলে তাদেরকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করেন। পরে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নেন।

এ ঘটনায় আহত বাবা-ছেলে থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পরদিন পুলিশ তদন্তে আসলে আওয়ামী লীগ নেতা কাশেম ও রবি শিকদার পুলিশকে জানান রমিজ ও তার ছেলে বিএনপির লোক। একথা শুনে পুলিশ উল্টো রমিজ ও তার ছেলেকে ধমক দিয়ে চলে যায়। বিএনপি নেতা রমিজের সেই দখ দখল করা জমিতে কাশেম শিকদার প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ করে আলিশান বাড়ি হাঁকিয়েছেন।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে কাশেম শিকদার এতোটাই হিংস্র ছিলেন যে, তিনি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে পর পর তিনবার জোরপূর্বক ইউপি মেম্বার হয়েছেন। দীর্ঘ ১৫ বছর মেম্বার থেকে দুর্নীতি-অনিয়ম ও চাঁদাবাজির টাকায় তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন । কাশেম শার্শার নাভারণ কাজিরবেড় এলাকায় এক বিঘা জমি কিনেছেন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এছাড়া তার গ্রামের বাড়ি ও বাজারের জমির বর্তমান মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। অথচ এক সময় পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ভিটের ৫ কাঠা জমি ছাড়া কাশেম শিকদারের তেমন কিছু ছিলো না। এই কাশেম কীভাবে এতো সম্পদের মালিক হয়েছেন তা খতিয়ে দেখার দাবি সাধারণ মানুষের।

রবির সাথে বিএনপির নেতার সখ্য ও বহিস্কার

স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সন্ত্রাসী রবি শিকদারের সাথে টানা ১০ বছর নাভারণ ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক খায়রুজ্জামান মিনুর। ছিল গভীর সখ্য। দীর্ঘ এই সময়কালে মিনুর কুপরামর্শে রবি ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার- নির্যাতন, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করেছেন। বিএনপি নেতা মিনুর বাড়িতে বসেই সব অপকর্মের পরিকল্পনা হতো। সম্প্রতি খায়রুজ্জামান মিনু সন্ত্রাসীদের নিয়ে ঝিকরগাছা উপজেলার হাড়িয়া নিমতলা বাজারে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারের গুদাম থেকে ৩শ’ বস্তা। চাল লুট করেন। যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় অভিযুক্ত খায়রুজ্জামান মিনুসহ বিএনপির ২১ নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মিনুর বিরুদ্ধে দলের এমন সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সর্বস্তরের মানুষ।

সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পরও দাপট কমেনি কাশেম শিকদার ও রবি শিকদারের সন্ত্রাসী বাহিনীর। তারা এখনো বীরদর্পে এলাকায় ঘুরছে বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের ওপর অব্যাহত রেখেছে জুলুম-নির্যাতন সূত্র মতে, আওয়ামী সরকারের পতনের তিনদিন আগেও কাশেম শিকদার ঝিকরগাছা থানায় নাশকতা মামলায় ফাঁসানোর জন্য বিএনপির ২০ জনের নামের একটি তালিকা দেন। যদিও সরকার পতনের কারণে তা সফল হয়নি। কাশেম-রবি বাহিনীর সদস্যদের বেশিরভাগই অবৈধ অস্ত্রধারী বলে জানা গেছে। সাধারণ মানুষ এদের হাত থেকে রক্ষা পেতে চান। তারা এজন্য যৌথ বাহিনীর আশু হস্তক্ষেপসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।