মেসির আর্জেন্টিনা কি ধরে রাখতে পারবে বিশ্বকাপের শিরোপা?

0
১৮ ডিসেম্বর, ২০২২: কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফিতে লিওনেল মেসির ঐতিহাসিক চুম্বন। একই সাথে তার হাতে রয়েছে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল'।। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বকাপ আসলেই বাংলাদেশে যে দলগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি মাতামাতি হয়, তার মধ্যে আর্জেন্টিনা সবার উপরে। এই ভালোবাসার শুরু ১৯৮৬ সালে, দিয়েগো মারাদোনার হাত ধরে। তারপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির প্রেমে পড়েছে।

এবার ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন লিওনেল মেসি। মারাদোনা ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জিতে ১৯৯০ সালে টানা দ্বিতীয়বার জেতার চেষ্টা করেছিলেন। ফাইনালে উঠেছিলেনও, কিন্তু মেক্সিকোর রেফারি এদগার্দো কোডেসালের বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্তে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। পশ্চিম জার্মানির আন্দ্রেস ব্রেহমে সেই পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি করে জার্মানিকে চ্যাম্পিয়ন করেন।

ঠিক ৩৬ বছর পর মারাদোনার উত্তরসূরি মেসির সামনে সেই অসম্পূর্ণ কাজটি করার সুযোগ এসেছে — টানা দুটি বিশ্বকাপ জেতার। বিশ্বকাপ চলাকালে ৩৯ বছরে পা দেওয়া মেসির জন্য এটিই প্রায় নিশ্চিতভাবে শেষ বিশ্বকাপ।

ইতিহাসের হাতছানি

ইতিহাসে মাত্র দুটি দল টানা দুবার বিশ্বকাপ জিততে পেরেছে — ১৯৩০-এর দশকে ইতালি এবং ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পেলের ব্রাজিল। ইতালির সেই কোচ ছিলেন ভিত্তোরিও পোজো — বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র কোচ যিনি টানা দুবার শিরোপা জিতেছেন। এবার মেসির পাশাপাশি কোচ লিওনেল স্কালোনির সামনেও সেই বিরল কীর্তি গড়ার সুযোগ।

অন্যদিকে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমও চেষ্টা করবেন ২০১৮ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জিততে। ১৯৯৮ সালে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানো দেশম ২০২২ সালের ফাইনালে স্কালোনির কাছে হেরেছিলেন। তাই প্রতিশোধের প্রেরণাও কম নেই তাঁর।

রেকর্ডের মহানায়ক

জুনের ১৬ তারিখ (বাংলাদেশ সময় ১৭ জুন) আলজেরিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামলে মেসি হবেন ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রথম খেলোয়াড়দের একজন। ইতিমধ্যে গত বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলে ২৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলার একক রেকর্ড গড়েছেন তিনি, পেছনে ফেলেছেন জার্মানির লোথার ম্যাথিউস (২৫ ম্যাচ) ও মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (২৪ ম্যাচ)।

ইন্টার মিয়ামিতে মাত্র ৬৪ ম্যাচেই গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ১০০তে পৌঁছে এমএলএসের ইতিহাসে দ্রুততম গোল কন্ট্রিবিউশনের রেকর্ড করেছেন তিনি।

গ্রুপ পর্যায়ের সমীকরণ

আর্জেন্টিনার গ্রুপে রয়েছে আলজেরিয়া (র‍্যাংকিং ২৮), অস্ট্রিয়া (র‍্যাংকিং ২৪) এবং প্রথমবার বিশ্বকাপে আসা জর্ডান (র‍্যাংকিং ৬৩)। তিন নম্বরে থাকা আর্জেন্টিনার জন্য গ্রুপটি যথেষ্ট সহজ। গ্রুপ শীর্ষে থাকলে দ্বিতীয় রাউন্ডে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ উরুগুয়ে, যারা কিনা মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।

দলের শক্তি ও সম্ভাবনা

গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজ এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরাদের একজন। ২০২২ সালের ফাইনালে টাইব্রেকারে নায়ক হওয়া এই গোলরক্ষক সম্প্রতি ক্লাব এস্টন ভিলাকে ইউরোপা লিগও জিতিয়েছেন।

রক্ষণে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওতামেন্দি অভিজ্ঞ জুটি। তবে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের কাফ ইনজুরি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

মধ্যমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ এখন কেবল একজন মিডফিল্ডার নন — চেলসিতে তাঁর পরিপক্বতা চোখে পড়ার মতো। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার লিভারপুলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বড় ম্যাচের চাপ সামলে এসেছেন। রড্রিগো ডি পল হয়তো অতটা মসৃণ নন, তবে মেসির ‘বডিগার্ড’ হিসেবে তাঁর ভূমিকা অমূল্য।

তরুণদের মধ্যে মাত্র ১৮ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদে সই করা ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুওনো এবং অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের থিয়াগো আলমাদাকে অনেকে এই বিশ্বকাপের ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’ হিসেবে দেখছেন।

আক্রমণে লাউতারো মার্টিনেজ ইতালীয় লিগে ১৭ গোল দিয়ে ইন্টার মিলানকে শিরোপা জিতিয়েছেন। মেসির সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া দুর্দান্ত। জুলিয়ান আলভারেজ (২৫) অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে এই মৌসুমে নজরকাড়া পারফরম্যান্স দিয়েছেন — গোল করার পাশাপাশি প্রেস, স্পেস তৈরি এবং মাঝমাঠ ও আক্রমণের সেতু হিসেবে তিনি অপরিহার্য।

স্কালোনির কৃতিত্ব

২০১৮ সালে অস্থায়ী কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া স্কালোনিকে তখন কেউ গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। কিন্তু আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে গড়ে তুলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার কৃতিত্ব পুরোটাই তাঁর। কাতারে সৌদি আরবের কাছে গ্রুপ ম্যাচে হেরেও দলকে শিরোপা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া — এটি কেবল কৌশল নয়, পারস্পরিক আস্থার জয়।

প্রতিদ্বন্দ্বীরাও প্রস্তুত

ফাইনালে হ্যাট্রিক করা এমবাপ্পের ফ্রান্স প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে। স্পেনের রয়েছে একঝাঁক দুর্দান্ত খেলোয়াড়। ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষ করতে মরিয়া ব্রাজিল। ইংল্যান্ড ও রোনালদোর পর্তুগালও স্বপ্নের বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুত।

তবু অভিজ্ঞতা, কৌশল, তারুণ্য আর ঐক্যের সমাহার ঘটানো এই আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার সামর্থ্য আছে। মেসির শেষ বিশ্বকাপটা রঙিন হোক — এই প্রত্যাশা কেবল আর্জেন্টাইন সমর্থকদের নয়, নিরপেক্ষ ফুটবলপ্রেমীদেরও।