মার্কিন কোষাগার সমৃদ্ধ করতেই ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক বৈশ্বিক পররাষ্ট্রনীতি

0
'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিতে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন কোষাগারকে সমৃদ্ধ করতে লেনদেনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বেছে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।। ছবি: সংগৃহীত
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে ক্ষমতায় এলেও দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যেকোনো উপায়ে দেশের কোষাগার সমৃদ্ধ করা। ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা হওয়ার চেয়ে যেকোনো লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তির অংশীদার হতেই বেশি আগ্রহী।
‘ট্রাম্প ২.০’ বা তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিতে মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয় দেশের সম্পদ থেকে টোল আদায়, শুল্ক আরোপ বা মালিকানা নেওয়ার চেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং পানামা খালের দিকেও তাঁর সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টি রয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া কার্গো জাহাজগুলোকে মার্কিন সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ শতাংশ টোল আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে আইনি জটিলতা ও ইরানের পূর্বের টোল ব্যবস্থার কারণে এই অবস্থান থেকে দ্রুত সরে আসেন তিনি।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প জানান, শিপিং কোম্পানির বদলে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ২০ শতাংশ ‘ইউনাইটেড স্টেটস রিইম্বারসমেন্ট ফি’র পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা তারা যুক্তরাষ্ট্রে করবে।
যদিও পর্যবেক্ষক গোষ্ঠীগুলোর মতে, ইরান যুদ্ধের খরচ ইতিমধ্যে ৪ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, যার আর্থিক প্রভাব সাধারণ আমেরিকানরা গ্যাস স্টেশনে গেলেই টের পাচ্ছেন। তা সত্ত্বেও ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আনার যে দাবি ট্রাম্প করেন, সিএনএন-এর ড্যানিয়েল ডেল তার কোনো প্রমাণ পাননি।

এদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে কানাডার খরচে নির্মিত গর্ডি হাউ ব্রিজের মালিকানা মিশিগানের ডেট্রয়েট এবং ওন্টারিওর উইন্ডসরের মধ্যে ভাগাভাগি করার দাবি তুলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক জটিল করে তোলেন ট্রাম্প। চুক্তি সংশোধনের কারণে সেতুর উদ্বোধন পিছিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, কানাডা আগামী ১৫ বছরের টোল থেকে পাওয়া নিট মুনাফার একটি অংশ একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিলের মাধ্যমে ভাগ করবে।

কানাডা সরকারের তথ্যমতে, সেতুটি আগামী ২৭ জুলাই খুলে দেওয়া হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, কানাডার খরচ উঠে আসার পরই মুনাফা ভাগাভাগি হবে বিধায় খুব বেশি নিট মুনাফা অবশিষ্ট থাকবে না।

অপরদিকে, ট্রাম্পের আমদানির ওপর অবৈধ শুল্ক আদায় অনুচিত ছিল বলে সুপ্রিম কোর্ট এ বছর রায় দেওয়ায়, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি (৪৯ বিলিয়ন) ডলার ব্যবসায়ীদের ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন এ বছরের শুরুতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার জন্য সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা দিলেও মাদুরো সরকারের বাকি অংশ ট্রাম্প প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং তারা ভেনিজুয়েলার তেল বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী মাদুরোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো ট্রাম্পকে তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার উপহার দিলেও, বিরোধীদের এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। ভেনিজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট আব্রামস একে ‘আত্মঘাতী নীতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রতি ট্রাম্পের বর্তমান উষ্ণ মনোভাবের পেছনে দেশটির প্রাকৃতিক ও বিরল খনিজ সম্পদের (রেয়ার আর্থ) প্রতি তাঁর আগ্রহ কাজ করছে। গত সপ্তাহে ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি ও লাইসেন্স করার অনুমতি দিয়ে মার্কিন কোম্পানি ও ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে অবাক করে দেন। তিনি দাবি করেন, যৌথ বিনিয়োগ তহবিলের চুক্তির ফলে দেশটির বিরল খনিজে আমেরিকার অংশীদারত্ব রয়েছে।

ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের প্রধান অভিযোগ হলো ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ দিচ্ছে না। এ বিষয়ে সিএনএন-এর ফরিদ জাকারিয়া মন্তব্য করেছেন, ট্রাম্পের চাপের কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হলেও এর ফলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যেতে পারে এবং একসময় আমেরিকানরা এই পুরোনো ন্যাটোকেই মিস করবে।