ভারত-চীন নয়, তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায়

0
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার পতাকা ।। ছবি: সংগৃহীত

সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে এই সফর অনুষ্ঠিত হবে। সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২২ জুন দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

একাধিক দেশের আমন্ত্রণ, বেছে নেওয়া হলো মালয়েশিয়া

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ একটি দেশ থেকে আসেনি। গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান। একই সময়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তাঁকে ফোনে শুভেচ্ছা জানানোর সময় সফরের আমন্ত্রণ দেন। পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের পক্ষ থেকেও বেইজিং সফরের আমন্ত্রণপত্র আসে।

গত এপ্রিল থেকে চীন বিশেষভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছিল। গত ৬ মে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর বৈঠকে তারেক রহমানকে জুনের শেষ সপ্তাহে বেইজিং সফরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়। গত ২৩ মে চীনের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২৩ থেকে ২৬ জুন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠিও ঢাকায় পৌঁছায়।

শেষ পর্যন্ত চীন বা ভারত—কোনোটিই নয়। গত ২৪ মে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ শুরু করে বাংলাদেশ হাইকমিশন। ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর গত ১ জুন কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে আনোয়ার ইব্রাহিমের পক্ষ থেকে ২১ ও ২২ জুন সফরের আমন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।

সিদ্ধান্তের পেছনে ভূরাজনৈতিক বিবেচনা

সূত্রগুলো বলছে, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্ধারণে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে দিল্লি বা বেইজিংকে বেছে নিলে অপর পক্ষকে অপ্রীতিকর বার্তা যেতে পারে — এই বিবেচনাই কার্যত তৃতীয় দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে সামনে এনেছে।

প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রী ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব সফর করবেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছিল। অতীতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীদের সৌদি আরবে প্রথম যাওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি। সার্কভুক্ত দেশ ভুটান দিয়ে প্রথম সফর শুরুর বিষয়টি নিয়েও সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের গন্তব্য কেবল প্রটোকলের বিষয় নয়, এটি নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারেরও একটি প্রতীকী বার্তা। সেই বিবেচনায় মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশের ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ।

বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা উত্তরোত্তর বাড়ছে। বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য মুসলিম দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্তটা বেশ ভালো।

সফরের সম্ভাব্য আলোচ্যসূচি

সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহের দিকে তা চূড়ান্ত হতে পারে বলে ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে সূত্রগুলো বলছে, অভিবাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

শিক্ষা খাত নিয়ে মালয়েশিয়ার আগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অন্তত ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বাংলাদেশ দেশটিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, প্রথম স্থানে রয়েছে চীন যাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৬২ হাজার। প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শিক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে একাধিক বাংলাদেশি কূটনীতিক জানিয়েছেন।

সামগ্রিকভাবে শুধু শ্রমবাজার নয়, শিক্ষা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশিল্পে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ার সম্ভাবনাও এই সফরে আলোচনায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে।