বেশি দামে বই বিক্রির সুযোগ করে দিচ্ছেন শিক্ষকরাই#শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য-৩

0

মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস ॥ ক্রেতাদের কমিশন বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মূল্যে বই বিক্রির সুযোগ শিক্ষকরাই করে দিচ্ছেন। তারা বই পাঠ্য তালিকাভুক্তির জন্যে মোটা অংকের টাকা নিয়ে কার্যত ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত দামে বই বিক্রির পথ সুগম করে দিচ্ছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সহজ-সরল অভিভাবকদের জিম্মি করে ব্যবসায়ীরা তথাকথিত ডোনেশন ও মুনাফার টাকা কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নিচ্ছে।
তথ্যানুসন্ধানকালে দেখা গেছে, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর দু’ মাস আগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষক সমিতির নেতারা ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ ও দর কষাকষি শুরু করেন। কে কতো দিতে পারবে, কিংবা কার কাছ থেকে কত টাকা আদায় করা যাবে- তা নিয়ে চলে দর কষাকষি। বইয়ের গুণ-মান বিবেচনা এখানে মূখ্য থাকে না- টাকাই মূখ্য। যেখানে বেশি টাকা পান সেখানে চুক্তিবদ্ধ হন শিক্ষকরা। অবশ্য, অতি চতুর ব্যবসায়ীরা সাথে সাথে রাজি হন না। তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং ছাত্র হাজিরা খাতা দেখে টাকার অংক নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে কেজি স্কুলের অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের বইয়ের জন্যে কম ‘ডোনেশন’ আর উচ্চ মূল্যের গাইড বা কথিত সহায়ক বই পাঠ্য তালিকাভূক্তির জন্যে লেনদেন হয় মোটা অংকের টাকা। যশোর শহরের বারান্দীপাড়ার চারশ’ ছাত্রছাত্রীর একটি কেজি স্কুলে এবার এক লাখ টাকার প্রলোভন দেয় এক বই ব্যবসায়ী।
অন্য একটি ছোট স্কুলে দেয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এ টাকাকে ঘুষ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বই ধরাতে গেলে দুভাবে টাকা দিতে হয়। একটা প্রকাশ্যে, আরেকটা গোপনে পেছনের দরজা দিয়ে। প্রকাশ্য টাকা প্রতিষ্ঠানের কাজে কিংবা শিক্ষকদের বনভোজন/শিক্ষা সফরে ব্যয় করা হয়। টাকার আরেকটি অংশ ব্যয় হয় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের পেছনে। তাদের ম্যানেজ করতে পারলে বই চালানো নিশ্চিত হয় বলে সেখানে টাকার অংক একটু বেশি লাগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, বই তালিকাভুক্ত করে অর্থ গ্রহণের কাজে শিক্ষকদের কিছু সমিতি জড়িয়ে পড়েছে। তারা বৃত্তি পরীক্ষাও চালু করেছে এই বাণিজ্য সচল রাখার জন্যে। সমিতির মাধ্যমে এক সাথে অনেক প্রতিষ্ঠানে বহু বই চালানো যায় বলে টাকাও বেশি দিতে হয়। কিন্ডার গার্টেন পর্যায়ে একাধিক সমিতি গড়ে উঠেছে মূলত এ বাণিজ্যের কারণে। এটা এখন বই ব্যবসায়ের অনিবার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত টাকা বিনিয়োগ ছাড়া বই চালানোর কথা ভাবতেই পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ওই ব্যবসায়ীর মতে, এটাই ঘুষ বা অনৈতিক উপায়ে অর্থ গ্রহণ। এ প্রক্রিয়ায় ‘ফাউ’ টাকা দেয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বেশি দামে বই বিক্রি করে ব্যবসায়ীরা এ টাকা অভিভাবকদের কাছ থেকে তুলে নিচ্ছেন। এভাবে লাইব্রেরীগুলো ব্যবসা সূত্রে বৈধভাবে মুনাফা লুটছে আর শিক্ষকরা ব্যবসায়ী না হয়েও সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বাণিজ্যিক ফায়দা লুটছেন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সরল প্রাণ অভিভাবকদের।
বই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শিক্ষকরা এমন সুবিধা নেয়ার কারণে তারা এতোটাই নতজানু হয়ে পড়েছেন যে, ক্রেতাদের কমিশন বন্ধ এবং অতিরিক্ত মূল্যে বই বিক্রির বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বই, খাতা ও উপকরণ পাঠ্য তালিকাভুক্ত করে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছেন।  এ প্রসঙ্গে কিন্ডারগার্টেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ মকবুল হোসেন বলেন, ব্যক্তি স্বার্থে টাকা নেয়া কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে টাকা নেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বই’র গুণ-মান অবশ্যই বিবেচনায় রাখা উচিৎ।