নকশায় ভুল: যশোরে ৪১ কোটি টাকার ৮ সেতু নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা

0
ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতু। সম্প্রতি যশোর সদর উপজেলার হাতিয়ানতলা বাজারে।। ছবি: সংগৃহীত

যশোরের তিন উপজেলায় চারটি নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর উচ্চতা নির্ধারিত মাপের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) গেজেট অনুযায়ী, নদীর পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে সেতুর গার্ডারের (ভারবাহী কাঠামো) ব্যবধান কমপক্ষে ১৫ ফুট হতে হয়। অথচ স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত এসব সেতুর ক্ষেত্রে গার্ডার আর পানির স্তরের ব্যবধান কোথাও ৬ ফুট, আবার কোথাও ৮ ফুট।

ঘটনার শুরু ২০১৮-১৯ সালে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ওই সময় যশোর সদর, মনিরামপুর ও শার্শা উপজেলায় এই আটটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। প্রকল্পটির মোট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। নির্মাণকাজ শুরু করার পর দেখা যায় সব কটি সেতুর নকশা ত্রুটিপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার কথা থাকলেও এলজিইডি তা নেয়নি।

পরবর্তীতে বিআইডব্লিউটিএর লিখিত চিঠি ও থানায় অভিযোগ সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে যায় প্রতিষ্ঠানটি। একপর্যায়ে বিষয়টি আদালতে গড়ালে ২০২৪ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেতু নির্মাণের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

ইতোমধ্যে আটটি সেতুর মধ্যে পাঁচটির প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। একটি সেতুর কাজ প্রায় শতভাগ শেষ হলেও বাকি সাতটির কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে আছে। সেতুগুলো পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হলে সরকারের গচ্চা যাবে ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা, অন্যদিকে বর্তমান নকশায় শেষ করা হলে স্থায়ীভাবে ধ্বংস হবে নৌপথ।

ভৈরব নদে তিন সেতু

যশোর সদর এলাকায় ভৈরব নদের ওপর তিনটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, এসব অংশে এখন নৌযান না চললেও ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে ট্রলার চলাচল করত।

  • ছাতিয়ানতলা সেতু: যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় ভৈরব নদের ওপর ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে এই সেতু। এর কাজের অগ্রগতি ৬০ শতাংশ। ২০২৩ সালে নদী খননের পর জোয়ার-ভাটা শুরু হলেও সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে। ছাতিয়ানতলা থেকে সাত কিলোমিটার ভাটিতে আফরা ঘাট হয়ে নোয়াপাড়া বন্দরে চলাচলের সুযোগ থাকলেও ব্রিজের উচ্চতার কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতু। সম্প্রতি যশোর সদর উপজেলার দাইতলা এলাকায় ।। ছবি: সংগৃহীত
  • দাইতলা সেতু: ছাতিয়ানতলা থেকে তিন কিলোমিটার উজানে দাইতলা এলাকায় ৪ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে দ্বিতীয় সেতুটি। ৮০০ মিটার বা ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়া এই সেতুর নিচে এখন কচুরিপনা জমেছে। সাময়িকভাবে চলাচলের জন্য পাশে স্থাপিত বাঁশের সাঁকো দিয়ে কেবল মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারে; ভ্যান বা রিকশা চলাচল করতে পারছে না।

ভৈরব নদের ওপর নির্মাণাধীন সেতু। সম্প্রতি যশোর সদর উপজেলা রাজারহাট এলাকায় ।। ছবি: সংগৃহীত
  • রাজারহাট সেতু: দাইতলা থেকে চার কিলোমিটার দূরে রাজারহাটে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ। পানি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত হলেও এটি নির্মিত হলে আশপাশের ৩০ গ্রামের হাজারো মানুষের উপকার হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বেতনা নদীতে দুই সেতু

যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারন বাসস্ট্যান্ড থেকে গোড়পাড়া আঞ্চলিক সড়কে বেতনা নদীর ওপর দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে দুটি সেতু নির্মাণ করছে এলজিইডি।

  • কাজীরবেড়-ইসলামপুর সেতু: ৬ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই সেতুর কাজের অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ। পাটাতন ঢালাই অর্ধেক বাকি থাকা অবস্থায় কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে নদী পার হয়ে নাভারন বাজারে ধান ও ফসল পরিবহনে প্রতি মনে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে বলে জানান স্থানীয় কৃষকেরা।

  • গাতিপাড়া সেতু: একই নদীর ওপর ৬ কোটি ৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর কাজ ৯২ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে এলজিইডি সংযোগ সড়ক না করায় স্থানীয় লোকজন নিজেদের উদ্যোগে মাটি ফেলে সড়ক বানিয়ে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করে নিয়েছেন।

মনিরামপুরে তিন সেতু

মনিরামপুর ও অভয়নগর এলাকার নদ-নদীতে আরও তিনটি সেতু নিয়ে একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।

মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতু। সম্প্রতি যশোরের মনিরামপুরের টাকের ঘাট এলাকায় ।। ছবি: সংগৃহীত
  • মুক্তেশ্বরী নদী সেতু (মোহনপুর-নওয়াপাড়া সড়ক): মনিরামপুর উপজেলা সদরের মোহনপুর বটতলা থেকে নওয়াপাড়া নৌবন্দর সড়কে ৭ কোটি ৫৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ৯৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটির ৮৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যে অংশে সেতু হচ্ছে সেখানে বর্তমানে নৌকা চলে না, তবে নদীতে এখনো জোয়ার-ভাটা রয়েছে।

  • মুক্তেশ্বরী নদী সেতু (হাজরাইল-নলঘোনা সড়ক): মনিরামপুরের হাজরাইল-নলঘোনা সড়কের এই সেতুর কাজ ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ব্যয়ে শতভাগ শেষ হয়েছে। তবে নকশা জটিলতার আইনি ঝামেলায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটি এখনো এলজিইডির কাছে হস্তান্তর করেনি।

  • শ্রী নদ সেতু (নেহালপুর): মনিরামপুরের নেহালপুরে শ্রী নদের ওপর ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ। দুই পাশের সংযোগ সড়ক বাকি থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ দায়িত্বে মাটি ও সংযোগ তৈরি করে সাময়িকভাবে যাতায়াত করছেন।

কেউ দায় নিচ্ছে না

কম উচ্চতার সেতু নির্মাণ ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কাজ চালু রাখা নিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তা ও নকশা বিভাগের দায়িত্বশীলদের মাঝে উদাসীনতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। যশোর এলজিইডির বর্তমান ও সাবেক প্রকৌশলীরা দাবি করছেন, প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বাঁচাতে বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি নেওয়া হয়নি, কারণ নদীগুলোতে এখন আর আগের মতো নৌযান চলে না।

অন্যদিকে এলজিইডির সেতু ডিজাইন শাখার প্রধানদের মতে, এখন কাজ চালাতে গেলে আদালত অবমাননার ঝুঁকি রয়েছে। মামলা প্রত্যাহার করা না হলে এই বিশাল বিনিয়োগ নষ্ট হবে। তারা এখন ক্রেন দিয়ে সেতুর গার্ডার তুলে নিয়ে পিলারের উচ্চতা বাড়িয়ে পুনরায় পাটাতন বসানোর পরিকল্পনার কথা বলছেন। যদিও গত আড়াই বছরে বিআইডব্লিউটিএর কাছে নতুন কোনো অনুমোদনের আবেদন করা হয়নি।

আদালতের নির্দেশনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভৈরব নদ সংস্কার আন্দোলনের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্ট যথাযথ নীতি অনুসরণ করার আদেশ দেন এবং একই বছরের জুনে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আদালতে হাজির হয়ে ছয় মাসের মধ্যে নীতি মেনে সেতু নির্মাণের লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে আজ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা মনে করছেন, আইনি ও নকশাগত জটিলতা নিরসন করতে এখন একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, নৌপথ রক্ষা ও জনভোগান্তি কমানো—উভয় দিক বিবেচনা করে মামলাকারী, স্থানীয় প্রশাসন ও এলজিইডির সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত একটি সমাধান খোঁজা হচ্ছে।