দৃষ্টিহীনতাকে জয় করে ডাক্তার হতে চায় হতদরিদ্র আরিফা

0

আজিজুল ইসলাম, বাগআঁচড়া (যশোর) সংবাদদাতা ॥ জীবনের শুরু থেকেই ঘোর অন্ধকার। এক চোখে নেই কোনো দৃষ্টি, আরেক চোখে শুধু আলো-ছায়ার অস্পষ্ট রেখা। পরিবারের ভিটেমাটি বলতে একটি জীর্ণ মাটির ঘর, যেখানে কেরোসিনের ডিবে আর টিনের চাল দিয়ে ঝরা জলই নিত্যসঙ্গী। এমন ঘোর হতদারিদ্র্য আর জন্মগত দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পথচলা যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের দিঘা গ্রামের কিশোরী আরিফা খাতুনের (১৭)। তবুও এই প্রতিকূলতা দমিয়ে রাখতে পারেনি তার অদম্য মেধা আর আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে।

দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক বাধা পেরিয়ে আরিফা এ বছর অর্জন করেছে এক অসাধারণ সাফল্য- এসএসসি পরীক্ষায় সে পেয়েছে জিপিএ-৫। এর আগে পিএসসি পরীক্ষাতেও সে সর্বোচ্চ জিপিএ অর্জন করেছিল। তার একমাত্র স্বপ্ন, একদিন ডাক্তার হয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবা করা।

আরিফার বাবা সোহারাব হোসেন পেশায় একজন ভ্যানচালক। প্রতিদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে তার আয় মাত্র দুই-তিনশ টাকা। এই স্বল্প আয়েই চলে পাঁচজনের সংসার, যার বেশিরভাগ সময় কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। শত অভাবের মধ্যেও মেয়ের শিক্ষাজীবন যেন থেমে না যায়, সেদিকে তার সতর্ক দৃষ্টি।

আরিফার পড়াশোনার পরিবেশ বলতে কিছুই নেই। ভাঙাচোরা মাটির ঘরে নেই কোনো ফ্যান বা পড়ার টেবিল। তবুও সেই সেমাইভেজা ঘরেই কেরোসিনের স্বল্প আলোয় রাত জেগে পড়াশোনা করে সে।

বাবা সোহারাব হোসেন মেয়ের সংগ্রামের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “মেয়ে এক চোখে কিছুই দেখে না, আরেক চোখেও খুব কম দেখে। তবুও ওর ইচ্ছা আর পরিশ্রম দেখে আমি হাল ছাড়তে পারি না। ও ডাক্তার হবে-এই স্বপ্নেই বেঁচে আছি।”

অর্থাভাবে আরিফার চোখের সঠিক চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরের চালিতাবাড়ীয়া হাই স্কুলে প্রতিদিন রাস্তা পার হয়ে যাওয়াও ছিল এক কঠিন যুদ্ধ। সামান্য দেখার ক্ষমতা নিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মাথায় নিয়েই সে একদিনও স্কুল কামাই করেনি।

এসএসসি পাসের পর সে এখন ভর্তি হয়েছে কলারোয়া সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার, যেখানে প্রতিদিন যাতায়াত খরচ প্রায় ১০০ টাকা। আরিফা জানায়, টাকার অভাবে অনেক দিনই ক্লাস করা হয় না। এইচএসসির ক্লাস শুরু হলেও এখনও তার বই কেনা হয়নি, সহপাঠীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরিফার মা ফিরোজা খাতুন বলেন, “মেয়ের প্রতি মাসে এক হাজার টাকার ওষুধ লাগে। দারিদ্র্যের কারণে বেশিরভাগ সময়ই কিনতে পারি না।”

এলাকাবাসী আরিফার মেধা ও দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করে এই পরিবারটিকে সরকারি সহায়তা দেওয়ার জোর দাবি জানান।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হলেও, পরিবারের অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থাই তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। চোখের কোণে জল নিয়ে আরিফা সমাজের কাছে আবেদন জানায়: “এক চোখে কিছুই দেখি না, আরেক চোখে খুব কম দেখি। তবুও আমি পড়তে চাই, ডাক্তার হতে চাই। বাবা কত দিন পারবেন জানি না। সরকার আর সমাজের সহায়তা চাই, আমার স্বপ্ন যেন মাঝপথে থেমে না যায়।”

আরিফার এই অসামান্য সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়েছেন শার্শা উপজেলা প্রশাসক কাজী নাজিব হাসান। তিনি বলেন, “দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়েও আরিফার এমন সাফল্য সত্যিই অনুকরণীয়। দারিদ্র্য ও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে যে দৃঢ়তার সঙ্গে সে এগিয়ে যাচ্ছে, তা আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরিফার শিক্ষাজীবনে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আমরা চাই এ ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন কোনো বাধায় থেমে না যাক।”