তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে থালাপতি বিজয়-ঝড়: চূর্ণ হলো দুই দ্রাবিড় দলের অর্ধশতকের আধিপত্য

0
তামিলনাড়ুতে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া থালাপতি বিজয় ২০২৪ সালে তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে) নামের দল প্রতিষ্ঠা করেন ।। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে রাজ্যটিতে চলে আসা ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে-র (AIADMK) দ্বিদলীয় আধিপত্য কার্যত চূর্ণ করে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দক্ষিণি চলচ্চিত্রের মহাতারকা থালাপতি বিজয়ের দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে)। দলটি বর্তমানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় অবস্থান করছে, যা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

নির্বাচনী ফলাফলের সবচাইতে চমকপ্রদ এবং প্রভাবশালী দিক হলো রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইয়ের রাজনৈতিক সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যাওয়া। ২০২১ সালের নির্বাচনে যেখানে ডিএমকে চেন্নাইয়ের ১৬টি আসনের সবকটিই জিতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল, এবারের নির্বাচনে সেখানে থালাপতি বিজয়ের দল ‘সুনামি’র মতো ধেয়ে এসেছে। আন্নানগর, টি-নগর, ভিল্লিভাক্কাম ও ভেলাচেরির মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে ভোটাররা প্রথাগত দুই বড় দলকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বিজয়ের নতুন শক্তির ওপর আস্থা রেখেছেন। এই পরিবর্তনের সবচাইতে বড় প্রতীকী চিত্র ফুটে উঠেছে যখন দেখা গেছে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন তাঁর নিজের কেন্দ্রেই পরাজিত হয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর ভোটারদের এই ‘নীরব বিপ্লবের’ পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় শাসনের ফলে জনগণের মধ্যে যে ক্লান্তি ও একঘেয়েমি তৈরি হয়েছিল, বিজয় তাকে পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষায় রূপ দিতে পেরেছেন। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো ভোটার হওয়া তরুণ সমাজ, বেতনভুক্ত পেশাজীবী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথাগত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দ্বিতীয়ত, জয়ললিতার প্রয়াণের পর এআইএডিএমকে-র সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ডিএমকে-র বিরুদ্ধে ওঠা একচেটিয়া ক্ষমতার অভিযোগ বিজয়ের পথকে আরও সুগম করেছে।

অন্যদিকে, তামিল জাতীয়তাবাদী নেতা সিমানের নেতৃত্বাধীন ‘নাম তামিলার কাচি’র (এনটিকে) মতো ছোট দলগুলো, যারা এতদিন ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র বাইরে একটি ‘তৃতীয় বিকল্প’ তৈরির চেষ্টা করছিল, তারা এবার কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। বিজয়ের এই জাদুকরী উত্থান তামিলনাড়ুর ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক মডেলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘদিনের পোক্ত সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে জনমানুষের আবেগ ও পরিবর্তনের সংকল্প বেশি শক্তিশালী হতে পারে। তবে থালাপতি বিজয়ের এই ‘আবেগের রাজনীতি’ দীর্ঘমেয়াদে শাসনব্যবস্থায় কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারবে, তা নিয়ে এখন থেকেই চুলচেরা বিশ্লেষণে মেতেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা।