ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক: ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর না যাওয়া প্রায় নিশ্চিত

0
দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনে সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর বাতিল হতে যাচ্ছে। উত্তেজনা প্রশমনে ঢাকার সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার।। ফাইল ছবি: সংগৃহীত
দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্ভূত এই টানাপোড়েনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সফর কর্মসূচিতে। ফলে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের বিশেষ আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ না নেওয়াটা এখন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সরকারের একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, দিল্লিতে সাম্প্রতিক ঘটনার পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বরের ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সহযোগিতা জোট বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ১৪ জুলাই এক প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস আউটরিচ পর্বে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অর্থনৈতিকভাবে উদীয়মান ১১টি দেশের জোট ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে সদস্য নয় এমন নির্বাচিত দেশ ও আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের যোগ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়ে থাকে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এবং বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করেন। বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত কড়া ভাষায় ভারতের কাছে তুলে ধরেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া এবং সেই মঞ্চ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ দেওয়াকে ঢাকা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ভারতকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সাদা দল ও ইউট্যাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “ভারত যদি গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সেখানে বসে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে ভারতকে নতুন করে ভাবতে হবে।”

সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন; মনে রাখতে হবে, দুটো বিপরীত। আশা করি, ভারতের কর্তৃপক্ষ ও ভারত সরকার বিষয়টি বুঝবে।”
তিনি ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া বা বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে যেন কোনো সমর্থন দেওয়া না হয়। বাংলাদেশ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতেই সুসম্পর্ক রাখতে চায়।

এদিকে ঢাকার এই কড়া প্রতিবাদের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দেশটির সরকারি অবস্থান স্পষ্ট করা হয়। ভারতীয় মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, দিল্লির ওই অনুষ্ঠান বা মঞ্চ থেকে বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যে সমস্ত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সরকার তার কোনো অনুমোদন দেয় না।

জয়সোয়ালের এই বক্তব্যকে ঢাকার কূটনৈতিক মহল ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাঁদের মতে, ভারতের এই বার্তা ইঙ্গিত দেয় যে উভয় দেশই সম্পর্ককে আর বেশি অবনতির দিকে নিয়ে যেতে আগ্রহী নয়।

সাম্প্রতিক এই ঘাটতি ও উত্তেজনা কাটিয়ে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে দুই দেশই যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এর অংশ হিসেবে আজ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে এবং আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক অচলাবস্থা, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

এদিকে ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’-র কূটনীতি বিষয়ক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন নাকি তৃতীয় দেশে যাবেন—সেটি একান্তই তাঁর নিজস্ব বিষয়। তবে এই মুহূর্তের উত্তেজনা পেরিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই ভারতকে উদ্যোগী হতে হবে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন ভিত্তিতে গড়ে ওঠার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা প্রত্যাশিত গতি পায়নি। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংবেদনশীলতার জায়গা বজায় রাখলে এখনো সম্পর্কের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।