চৌগাছায় সড়কগুলোতে শুকানো হচ্ছে ক্ষেতের ধান, অপূরণীয় ক্ষতি কৃষকের

0

 

মুকুরুল ইসলাম মিন্টু, চৌগাছা (যশোর) ॥ ঘূর্ণিঝড় অশনি’র প্রভাবে চৌগাছায় বৃষ্টির কারণে বোরো ধানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। জমিতেই ধানের কল (চারা) বের হয়ে গেছে। কিছুটা রোদ্রোজ্জল আবহাওয়া দেখা দিলেই কৃষাণ-কৃষাণী ছুটছেন মাঠে সোনার ফসল রক্ষার জন্য। গ্রামাঞ্চলের উঁচু জায়গা বা পাকা সড়কই এখন কৃষকের ধান রক্ষার নিরাপদ জায়গা হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে এই জনপদের কৃষকরা ১৮ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করেন। ধান কাটার আগ পর্যন্ত আবাহওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতিটি জমিতে ধানের বাম্পার ফলন হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়াতে বোরো চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
গতকাল (শনিবার) চৌগাছা উপজেলার স্বরুপদাহ, বহিলাপোতা, বাঘারদাড়ি, কংশারীপুর গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কৃষাণ-কৃষাণীরা বিরামহীনভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। জমিতে কেটে রাখা ধানের ওপরে পানি উঠে আছে। সেই পানির মধ্য থেকে তারা ধান তুলে নিয়ে আসছেন পাশের পাকা সড়কে। অধিকাংশ ধানে কল বা চারা বের হয়ে গেছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই ফলন অনেক কমে যাবে। কষ্টের ফসলকে রক্ষায় চলছে কাদের বিরামহীন পরিশ্রম। এদিকে যেসব চাষি এখনও ধান কাটেননি, তাদের পাকা ধান বাতাসে জমিতে পড়ে গেছে। এই ধানেও চারা বের হয়েছে। এই ক্ষতি কীভাবে পুশিয়ে নিবেন সেই চিন্তায় বিভোর কৃষক।
বহিলাপোতা গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন এ বছর ৬ বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেন। ধান কাটার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমন না থাকায় বাম্পার ফলন হয়। ঈদের আগের দিন তিন বিঘা জমির ধান কাটেন তিনি, বাকিটা ঈদের পর কাটার কথা ছিল। কিন্তু বৃষ্টিতে কেটে রাখা সেই ধান পানিতে ভাসতে থাকে। আর যে ধান কাটা হয়নি তাতে পানি উঠে গেছে। এখন কেটে রাখা ধান জমি থেকে সড়কে আনার চেষ্টা করছেন তিনি। বাঘারদাড়ি গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, তিন বিঘা জমিতে বোরো চাষ করা হয়, সব ধানেই এখন চারা বের হয়ে গেছে। জোন বা শ্রমিক সঙ্কটের কারণে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ওই পচাগলা ধান এনে সড়কে বিছিয়ে রেখেছেন। পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার দাড়িয়াপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম বাঘারদাড়ি গ্রামে মেয়ে জামাইয়ের বাড়িতে এসেছেন। জামাইয়ের ধান পানিতে ভাসছে, চারা বের হয়ে নষ্ট হয়েছে ধান। তিনিও জমির পানিতে ভাসা ধান তুলে সড়কে বিছিয়ে সাহায্য করছেন। তিনি বলেন, এই বৃষ্টিতে চাষির ক্ষতির শেষ নেই। কীভাবে চলবে সামনের দিনগুলো সেই চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছে। বহিলাপোতা গ্রামের কৃষানী ফাতেমা বেগম। সংসারের সব কাজ ফেলে রেখে ভোর বেলায় চলে এসেছেন মাঠে। জোনেরা বিলের জমি থেকে ধান তুলে সড়কে নিয়ে আসছেন আর ফাতেমা বেগম সেই ধান সড়কে বিছিয়ে রোদে শুকানোর চেষ্টা করছেন। স্বরুপদাহ গ্রামের কৃষক সোহেল রানা, হাসান আলী, আরিফ হোসেন, সাজু মিয়া, তামীম হাসান বলেন, ‘বোরো ধান নিয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিল। ধান ভালভাবে বাড়িতে আসবে, সেই ধান বিক্রি করে দেনা শোধের পর সংসারের অন্য ব্যয় বহন করবো। কিন্তু সব স্বপ্ন বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে।’ তারা জানান, বর্তমানে এক বিঘা ধান কাটতে জোন খরচ হচ্ছে ৬ হাজার টাকা। জমি থেকে সড়কে তুলতে নিচ্ছে ২ হাজার, মাড়াই করা মেশিনে সেই ধান ঝাড়তে নিচ্ছে দেড় হাজার টাকা আর জমি প্রস্তুত থেকে ধান পাকা পর্যন্ত যে ব্যয় হয়েছে সব মিলিয়ে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা বিঘা প্রতি খরচ হয়েছে। কীভাবে এই লোকসান কাটিয়ে উঠা যায় তার কোন পথ যেন কৃষক খুঁজে পাচ্ছেন না। গ্রামাঞ্চলের মধ্য দিয়ে পাকা সড়ক হওয়ায় কৃষকের কিছুটা স্বস্তি, কেননা মাঠের পানির মধ্য হতে ধান উঠিয়ে তা সড়কে ফেলে শুকাতে পারছেন। গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি সড়ক এখন বোরো ধানের দখলে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সমরেন বিশ্বাস বলেন, বোরো ধান যে সময়ে কাটা শুরু হবে সেই মুহূর্তে বৃষ্টিতে কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। বর্তমানে ধান রক্ষার জন্য জমি থেকে ধান তুলে উঁচু স্থানে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি ধান ঝাড়ার পর রোদ পেলেই শুকানোর কথা বলা হচ্ছে।