কুরবানিকে সামনে রেখে শার্শায় দা বটি তৈরিতে ব্যস্ত কামারশিল্পের কারিগররা

0
ছবি: সংগৃহীত।

মো. কামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর) ॥ কুরবানির পশুর মাংস কাটার দা বটি ছুরি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের শার্শা উপজেলার কামারশিল্পে জড়িত কারিগররা। উপজেলার বাগআঁচড়া, নাভারণ, বেনাপোল, সাতমাইল, শার্শা সদর ও বিভিন্ন হাট-বাজার এলাকার কামারপল্লী গুলোতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে আগুন জ্বেলে লোহা গরম করে দা, বটি, ছুরি, চাপাতি ও কুড়াল তৈরির কাজ।

হাতুড়ির টুংটাং শব্দ, আগুনের লেলিহান শিখা আর কয়লার ধোঁয়ায় মুখর হয়ে উঠেছে শার্শার কামারপল্লীগুলো।ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কুরবানির সরঞ্জামের চাহিদা। কেউ নতুন দা-বটি বানাতে আসছেন, আবার কেউ পুরনো ছুরি বা চাপাতি শান দিয়ে ধারালো করে নিচ্ছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন কামারশালায় একসঙ্গে কয়েকজন কারিগর কাজ করছেন। কেউ আগুনে লোহা গরম করছেন, কেউ ভারী হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আকার দিচ্ছেন, আবার কেউ মেশিনে ধার দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও দোকানের সামনে সকাল থেকেই সিরিয়াল ধরে অপেক্ষা করছেন ক্রেতারা।

বেনাপোল হাড়িহাটা রোড এলাকার কামার কারিগর স্বপন রায় বলেন, সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কিন্তু কুরবানির ঈদের আগের এই সময়টাই আমাদের মূল মৌসুম। এখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছি। অনেকেই নতুন দা-বটির পাশাপাশি পুরনো জিনিসও শান দিচ্ছেন।

শার্শা এলাকার কামার সুদিব কর্মকার বলেন, আগে হাতে হাপর টানতে হতো। এখন মোটরের সাহায্যে বাতাস দেওয়া হয়। এতে কিছুটা সুবিধা হয়েছে। তবে আগুনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করা এখনও খুব কষ্টের।

কামাররা জানান, লোহা, কয়লা, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। আগে যে কয়লা প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। একইভাবে ভালো মানের স্প্রিং লোহার দামও বেড়েছে অনেক।

কারিগররা আরও জানান, টেকসই ও ভালো ধার ধরে রাখতে তারা পুরনো গাড়ির স্প্রিংয়ের ইস্পাত ব্যবহার করেন। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ায় পণ্যের দামও বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

বর্তমানে শার্শার বিভিন্ন বাজারে মাঝারি আকারের একটি দা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকায়। বড় চাপাতির দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, বটি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং কুরবানির ছুরি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বড় মাংস কাটার ছুরি, কুড়াল ও ছোট চাকুর দামও বেড়েছে।

অন্যদিকে পুরনো দা বা ছুরি শান দিতে নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। বড় চাপাতি বা কুড়াল মেরামত ও ধার করতে খরচ পড়ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। অনেক দোকানে এখন আলাদা মেশিনে তাৎক্ষণিক ধার দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

বেনাপোল এলাকার ব্যবসায়ী লাভলু হোসেন বলেন, বিদেশি স্টিলের ছুরি বাজারে অনেক আছে। কিন্তু দেশি কামারের বানানো চাপাতি ও বটির ধার বেশি টেকে। তাই এখনও মানুষ দেশি পণ্যের ওপর ভরসা রাখে।

কামারশিল্পের কারিগররা জানান, আগের মতো এখন আর নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কঠোর পরিশ্রম, আগুনের তাপ ও কম লাভের কারণে তরুণরা অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। ফলে দক্ষ শ্রমিক সংকটও বাড়ছে।

শার্শার মিঠুন কর্মকার ও বেনাপোলের বিশ্বজিৎ, আকাশ কর্মকরসহ একাধিক কামার জানান, ঈদের আগের শেষ তিন-চার দিন সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। এ সময়টা নতুন অর্ডারের পাশাপাশি পুরনো সরঞ্জাম শান দিতে ক্রেতাদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাদের দাবি, সরকারিভাবে সহজ ঋণ ও কারিগরি সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও টিকে থাকবে এবং নতুন প্রজন্মও আগ্রহী হবে।