কচুয়া হাসপাতালের জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা

চিকিৎসক সংকট অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ

0
ছবি: সংগৃহীত।

আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট ॥ বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়ে চলছে সেবাদান। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি এখানে রয়েছে জটিল অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দি রয়েছে এক্সরে মেশিন। বাধ্য হয়ে রোগীরা যাচ্ছেন জেলা হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকের সামনে সাদা কাগজে বড় অক্ষরে লেখা ‘ঝূকিপূর্ণ স্থাপনা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।’ এই জরাজীর্ণ ভবনে জরুরি বিভাগের পাশাপাশি চলছে স্বাস্থ্য সহকারীদের কার্যালয়, টিকাদান কর্মসূচি, সেবিকা কক্ষ ও ভর্তি রোগীদের জন্য চারটি শয্যাসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত বেশকিছু কার্যক্রম।

ভবনের ছাদ থেকে মাঝে মাঝে পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেওয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ঝুঁকি নিয়েই চলছে স্বাস্থ্য সেবা। আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও তার স্বজনেরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৬ সালে স্থাপিত ৩১ শয্যা বিশিষ্ট কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ২০০৫ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। হাসপাতালটিতে ৩৪জন চিকিৎসকের বিপরীতে ২১টি শূন্য পদ রয়েছে। এছাড়া ১৯৭২ সালের একটি মেশিন দিয়ে চলছে এক্সরে কার্যক্রম। অথচ ৯ মাস ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে আধুনিক ডিজিটাল এক্সরে মেশিন। ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকায় সাত মাস ধরে বন্ধ রয়েছে সব ধরনের রোগের পরীক্ষা।

অন্যদিকে হাসপাতালে আধুনিক অপারেশন থিয়েটার থাকলেও পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কোনো জটিল অপারেশন হয় না এই হাসপাতালে। এক সপ্তাহ আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত পিতাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন হাজরা খালি গ্রামের বাসিন্দা আহম্মেদ আলী বলেন, বাবা এখানে ৭ দিন ধরে ভর্তি রয়েছে। এখানে আগে দুটো ভবন ছিল। একটা পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ায় মহিলা পুরুষ সব এই জায়গায় থাকে। শয্যা সংকটে আমরা হাসপাতালের বারান্দাতে জায়গা পেয়েছি। রাত নেই, দিন নেই সবা কে এক জায়গাতেই থাকতে হয়। যেটা মহিলা ও পুরুষ রোগীর জন্য বিড়ম্বনা।

রোগীর স্বজন ইমরান মল্লিক বলেন, আমার স্ত্রীকে নিয়ে এইখানে ভর্তি হয়েছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, ছাদের বিভিন্ন জায়গার রড বের হয়ে আছে। পর্যাপ্ত শয্যা নেই, ফ্যান নেই, বাথরুমের সংকট।

ঝুঁকিপূর্ণ এই ভবনটিতে যেকোনো সময়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দুইটা ভবনের একটি নষ্ট হওয়ায় রোগীদের বারান্দায় রাত যাপন করতে হচ্ছে। এখানে রোগীকে সেবা নেওয়ার জন্য আসলে রোগীসহ স্বজনদের রোগী হয়ে ফিরতে হচ্ছে।

সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার শেখ আসাদুজ্জামান বলেন, আমি এই সরকারি কোয়ার্টারে দীর্ঘদিন ছিলাম। কিন্ত এটা এখন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এখানে বসবাস করার উপযোগী আর নেই। আমি জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে এখান থেকে গিয়ে বাইরে থাকছি। কিন্তু এখানে কর্মচারীরা থাকছে। যেকোনো সময়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, হাসপাতালের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মুশফিকুর রহমান তরফদার বলেন, হাসপাতালের ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে বসেই আমাদের সেবা দিতে হচ্ছে। ভবনের কয়েকটি জায়গা বড় বড় ফাটল ধরেছে। জীবনের ঝুকি নিয়েই সেবা দিচ্ছি। যখন ভূমিকম্প বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে তখন আরও বেশি ঝুঁকি বেড়ে যায়। এখানে জরুরি বিভাগ, অন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৩০০-এর অধিক রোগী আসে।

কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাসান মাহমুদ বলেন, হাসপাতালে চলমান এক্সরে মেশিন দিয়ে ঠিকমত এক্সরে হয় না। আর নতুন যে এক্সরে মেশিন দিয়েছে সেটা চালাতে ৮০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে, সেখানে পুরো হাসপাতাল চলছে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুতে। এছাড়া এক্সরে মেশিনের জন্য একটি নতুন কক্ষও লাগবে। এসব চাহিদার জন্য পল্লী বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দিলেও কোনো কাজ হয়নি।

ছবি: সংগৃহীত।

এছাড়া পরিত্যক্ত ভবনসহ অন্যান্য সংকটের বিষয়টি বারবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো উপকার হয়নি বলে জানান এই কর্মকর্তা।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ স ম মাহাবুবুল আলম বলেন, পুরানো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এক্সরে মেশিন চালাতে সাবস্টেশন প্রয়োজন। যা এই মুহূর্তে সম্ভব না, তাই এটি অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সরকার যেহেতু জনগণের কথা ভাবছে, তাই আশা করি সংকট দ্রুত নিরসন হবে।