১৭৪ যাত্রীর প্রাণ বাঁচানো অসীম সাহসী পাইলট কে এই স্মিথ?

0
ককপিটে হামলার শিকার হয়েও ১৭৪ যাত্রীর জীবন রক্ষা করা ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার।। ছবি: সংগৃহীত

কে এই স্মিথ –১৭৪ জন যাত্রী নিয়ে মাঝ আকাশে উড়োজাহাজ চালানোর সময় সহকারীর ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হয়েও অসীম সাহসিকতায় সবার প্রাণ রক্ষা করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছেন এক ভারতীয় পাইলট।

রক্তাক্ত শরীরে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উড়োজাহাজটিকে নিরাপদে অবতরণ করানো সেই বীর পাইলট হলেন ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার। নিজের পেশাগত বিবরণীতে তিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চালানোর কথা লিখেছেন। আরও লিখেছেন, উড়োজাহাজ চালাতে গিয়ে তিনি সব সময় ‘নিরাপত্তার প্রতি গভীর মনোযোগ’ দিয়ে এসেছেন।

ককপিটে হামলা ও সাহসিকতার পরীক্ষা

গতকাল বুধবার পেশাগত জীবনের সেই ‘নিরাপত্তাবোধের’ সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হয়েছে স্মিথকে। মাঝ আকাশে থাকা একটি উড়োজাহাজের ককপিটে ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। তাঁরই একজন সহকারী পাইলট ককপিটে স্মিথকে ছুরিকাঘাত করেন। সন্দেহ করা হচ্ছে, উদ্দেশ্য ছিল যাত্রীবোঝাই উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করানো।

উড়োজাহাজটি ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের, যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবে যাচ্ছিল এবং এতে ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। উড়োজাহাজটি ওমানের আকাশসীমায় থাকার সময় এ হামলা হয়। হামলার পর তড়িঘড়ি করে উড়োজাহাজটির মুখ সৌদি আরবের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয় এবং সেটিকে সৌদি আরবের তাবুক শহরের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়।

ফ্লাইদুবাইয়ের ওই উড়োজাহাজের যাত্রীদের সৌদি আরব থেকে ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তেল আবিব, ইসরায়েল ।। ছবি: সংগৃহীত

স্মিথের পেশাগত জীবন ও বিশ্বনেতাদের প্রশংসা

ক্যাপ্টেন স্মিথের লিংকডইনে লেখা রয়েছে, বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে তাঁর ১৩ বছরের অভিজ্ঞতা। সেখানে তিনি জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। পেশাজীবনের শুরুর দিকে তিনি মুম্বাইভিত্তিক ভারতীয় উড়োজাহাজ সংস্থা স্পাইসজেটে কাজ করতেন।

ককপিটে রক্তাক্ত হওয়ার পরও উড়োজাহাজটি এবং ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন রক্ষা করায় রীতিমতো ‘নায়ক’ বনেছেন স্মিথ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই পাইলটের ভূয়সী প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন।

আরও পড়ুন: 
পাইলট ও যাত্রীদের সাহসিকতায় রক্ষা পেল ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজ
নেতানিয়াহু তাঁর পোস্টে লেখেন, ‘ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি (স্মিথ) লড়াই করেছেন। হামলাকারীকে প্রতিহত করেছেন। ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন। এতে যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করতে পেরেছেন। ফলে মাঝ আকাশে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে।’
এক্স পোস্টে নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, ‘ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি (স্মিথ) অসীম সাহস ও অন্যদের জীবন রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প দেখিয়েছেন। তাঁর সাহস শত শত মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। বড় একটি বিপর্যয় এড়াতে সহায়তা করেছে।’

ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ। ইসরায়েলের তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।। ছবি: সংগৃহীত

হাসপাতালে চিকিৎসা ও পরিবারের খোঁজ

এ ঘটনার পর ক্যাপ্টেন স্মিথ সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রিয়াদে ভারতীয় দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছে, স্মিথের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে।

পোস্টে আরও বলা হয়েছে, ‘আমরা তাঁর (স্মিথের) পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়ে নিয়মিত যোগাযোগ করা হবে। তাঁর সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।’ ভারতের মুম্বাইয়ের ঘাটকপার ইস্ট এলাকায় থাকেন স্মিথের পরিবার। ঘটনা শুনে ক্যাপ্টেন স্মিথের মা–বাবা ভোরেই সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ক্যাপ্টেন স্মিথের স্ত্রী ও দুই সন্তান দুবাইয়ে থাকেন।

ব্যবস্থাপনা থেকে উড়োজাহাজের ককপিটে

পাইলট হওয়ার কোনো ইচ্ছা শুরুতে স্মিথের ছিল না। গত বছর একটি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের কাপড়ের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে এবং সেই ব্যবসার হাল ধরার ইচ্ছা ছিল তাঁর। ব্যবসা বড় করার জন্য তিনি ব্যবস্থাপনায় পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। ব্যবস্থাপনায় পড়ার সময় উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নেন তিনি, যা তাঁর জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।

পডকাস্টে স্মিথ জানান, পাইলট পেশা বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা শুরুতে তাঁর মা কিছুতেই মেনে নিতে চাননি। তবে গত এক দশকে ভারতের উড়োজাহাজ চলাচল খাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া সহজ হয়। স্মিথ বলেন, তখন মা ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এবং উড়োজাহাজ চালানোর বিষয়টি তাঁকে চিন্তায় ফেলেছিল।

হামলাকারী আটক ও শেষ পরিস্থিতি

স্মিথের ওপর হামলাকারী পাইলট এখন সৌদি আরবে গ্রেপ্তার আছেন এবং তাঁকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করছে। অপরদিকে ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটির যাত্রীদের নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।