টিআরএম ঘিরে নতুন আশার আলো, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগের পথে সরকার

এই উদ্যোগ শুধু সাতক্ষীরা-খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনেই নয়, যশোরের বহু আলোচিত ভবদহ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে

0

শিকদার খালিদ, লোকসমাজ : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি। সাতক্ষীরা ও খুলনার বেতনা-মরিচ্চাপ অববাহিকায় নতুন করে টিআরএম বাস্তবায়নের সরকারি উদ্যোগকে ঘিরে উপকূলজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন আশার সঞ্চার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু সাতক্ষীরা-খুলনার জলাবদ্ধতা নিরসনেই নয়, যশোরের বহু আলোচিত ভবদহ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শনিবার (১০ মে) পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি উচ্চপর্যায়ের টেকনিক্যাল প্রতিনিধি দল সাতক্ষীরার বেতনা-মরিচ্চাপ অববাহিকা এবং খুলনার কয়েকটি বিল এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে একটি নতুন ও সমন্বিত টিআরএম প্রকল্পের প্রস্তাবনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। শনিবার পরিদর্শনের প্রতিবেদন প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের জন্য একনেক-এ পাঠানো হতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ টিআরএম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো স্বাভাবিকভাবে জোয়ার-ভাটানির্ভর। কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী ভরাট এবং পলি জমার কারণে বেতনা, কপোতাক্ষ, হরি, মুক্তেশ্বরী ও ভদ্রাসহ বহু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, যা প্রতি বছর লাখো মানুষের জীবন ও কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
স্থানীয় পানি কমিটি ও পরিবেশকর্মীদের মতে, শুধুমাত্র নদী খনন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ কয়েক মাসের মধ্যেই আবার নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যায়। অন্যদিকে টিআরএম পদ্ধতিতে জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে বিলে প্রবেশ করে, সেখানে পলি জমে ভূমি উঁচু হয় এবং একই সঙ্গে নদীর তলদেশ গভীর থাকে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে এবং জলাবদ্ধতা কমে।

ভবদহের সঙ্গে কী সম্পর্ক?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতনা-মরিচ্চাপ অববাহিকার সঙ্গে যশোরের ভবদহ এলাকার সরাসরি সংযোগ রয়েছে। কারণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো একটি আন্তঃসংযুক্ত পানি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে এক এলাকায় নদী ভরাট বা পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে অন্য এলাকাতেও।
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা ভবদহ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি নামতে পারে না। ফলে বছরের পর বছর হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবদহ সমস্যার অন্যতম কারণ হলো বেতনা-কপোতাক্ষ অববাহিকায় পলি জমা এবং জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া। তাই বেতনা-মরিচ্চাপ এলাকায় কার্যকর টিআরএম বাস্তবায়ন হলে তা ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকেও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অতীতে বিল কেদারিয়া, বিল খুকশিয়া ও বিল পাখিমারাসহ বিভিন্ন এলাকায় টিআরএম বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এসব এলাকায় নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা কমার ইতিবাচক ফলও দেখা যায়। তবে ক্ষতিপূরণ জটিলতা, স্থানীয় বিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে অনেক উদ্যোগ স্থায়ী রূপ পায়নি।
এবার সরকার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের জন্য ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে ক্ষতিপূরণ বণ্টনে স্বচ্ছতা ও গতি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে টিআরএম
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে টিআরএম

জনগণের প্রত্যাশা
সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা সদর, তালা, কেশবপুর ও মনিরামপুর এলাকায় বিভিন্ন পানি কমিটি ও সামাজিক সংগঠন টিআরএম বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। স্থানীয়দের মতে, টেকসই ও অংশগ্রহণমূলক টিআরএম ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ সংগঠনগুলোর মধ্যে ভবদহ পানি নিস্কাশন আন্দোলন কমিটি, বেসরকারি সংস্থা উত্তরণ, পানি কমিটি উল্লেযোগ্য।পরিদর্শনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি দল শনিবার স্থানীয় কৃষক, ভূমি মালিক ও পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এর বড় পরীক্ষায় সরকার
বিশ্লেষকদের মতে, বেতনা-মরিচ্চাপ অববাহিকায় নতুন টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন শুধু একটি স্থানীয় উদ্যোগ নয়; বরং এটি ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এর কার্যকারিতারও বড় পরীক্ষা। প্রকল্পটি সফল হলে ভবদহসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি টেকসই মডেল তৈরি হতে পারে।
এখন উপকূলবাসীর অপেক্ষা দীর্ঘ আলোচনার পর এবার বাস্তবায়নের পথে কত দ্রুত এগোয় বহু প্রতীক্ষিত টিআরএম উদ্যোগ।