তৃণমূলের রাজনীতি থেকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মির্জা ফখরুল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। ছাত্রনেতা, শিক্ষক, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার বিস্তারিত।

0
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর- সংগৃহীত ছবি

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ছাত্রনেতা, শিক্ষক, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা ধাপ অতিক্রম করে এবার দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

৭৮ বছর বয়সী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছেন। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন।

বর্তমানে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়।

ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয় ছাত্রজীবন থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন।

অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি পূর্ণকালীন রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে

১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।

দলের সাংগঠনিক বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব এবং পরবর্তীতে মহাসচিবের দায়িত্বে আসীন হন। বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহ-সভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। একই মেয়াদে তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়ী হতে পারেননি। তবে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে বিজয়ী হন। পরে নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

সংকটকালে বিএনপির কাণ্ডারি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিবর্তন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল এবং দলের ওপর নানা চাপের সময়ে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র ও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা এবং তারেক রহমানের বিদেশে অবস্থানের সময়ে দেশের ভেতরে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে একাধিকবার কারাবরণও করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ী এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।

ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী রাহাত আরা বেগম এবং দুই কন্যা—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহকে নিয়ে পারিবারিক জীবনযাপন করেন। তাঁর বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এবং ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা

ছাত্রনেতা ও শিক্ষক থেকে শুরু করে তৃণমূলের রাজনীতিবিদ, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর এবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, দলের সংকটময় সময়ে তাঁর দীর্ঘ ত্যাগ, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনীত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর মনোনয়ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।