হামের টিকা সংকট তদন্তে ৩ সদস্যের কমিশন, ৬০ কার্যদিবসে প্রতিবেদন

0

লোকসমাজ ডেস্ক : দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর পেছনে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে বিলম্ব, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কমিশন গঠন করেছে সরকার। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হামের টিকা ব্যবস্থাপনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য ব্যর্থতার জন্য দায়ীদেরও চিহ্নিত করবে কমিশন।

বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে। তিন সদস্যের এই কমিশনকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

হাই কোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানকে কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের (বিসিপিএস) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলাম।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে হামের টিকা কেনা, সরবরাহ ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করবে কমিশন। এসব কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তা-ও পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়-দায়িত্ব নিরূপণ করবে কমিশন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে মারা গেছেন ১০৫ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায়ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে হামের প্রকোপ দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় টিকা সরবরাহের ঘাটতি এবং টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এপ্রিল ও মে মাসে টিকা সংকট প্রকাশ্যে এলে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়।

পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ না করার অভিযোগের মধ্যেই একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন সরকার ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়।

হামের টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় টিকা সংগ্রহ করত। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের বড় অংশ আসত দাতাদের সহায়তা থেকে।

কিন্তু ২০২৫ সালে টিকা সংগ্রহকে রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এ পরিবর্তনের কারণে টিকা সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ হয়েছিল কি না এবং সিদ্ধান্তটি সরবরাহ সংকট তৈরিতে কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা কমিশনের তদন্তে গুরুত্ব পেতে পারে।

এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক বিরূপ পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কারণেও টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখনই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মার্চে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে গেলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় তৎকালীন সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে গত ২০ মে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি জানান, টিকার ঘাটতি নিয়ে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে অন্তত ১০টি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।

এর আগে বাংলাদেশে টিকার ‘আসন্ন ঘাটতি’ নিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি দিয়েছিলেন রানা ফ্লাওয়ার্স। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি পাঠানো ওই চিঠির বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ইউনিসেফের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্ক করা এবং বৈঠক করার পরও পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে তৎকালীন সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কেন টিকা ব্যবস্থাপনায় সংকট তৈরি হয়েছিল—এসব বিষয় এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দেশে হামে মৃত্যু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। নতুন সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আগের সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং সংকট মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে দেশে-বিদেশে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাড়ে আট মাস পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার টিকা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিশন গঠন করা হলো।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬’-এর অধীনে কমিশনটি গঠন করা হয়েছে।

কমিশন হামের টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্ব, সময়ক্ষেপণ, অনিয়ম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করবে। টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্তগত বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঘটেছিল, কার সিদ্ধান্তে বিলম্ব হয়েছে এবং এর ফলে জনস্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা-ও অনুসন্ধান করবে।

পাশাপাশি এসব ঘটনায় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টতা ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে টিকা ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের সংকট এড়াতে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে কমিশন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কমিশনকে প্রয়োজনীয় সচিবিক সহায়তা দেবে। কমিশনের চাহিদা অনুযায়ী তদন্তের ব্যয় নির্বাহ এবং প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।

৬০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর হামের টিকা সংকটের পেছনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিত্র তুলে ধরবে কমিশন।