শিকদার খালিদ : সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন যদি যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে কিংবা রাজনৈতিক তদবিরে নির্ধারিত হয়, তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠে আসছে। এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় মধ্যস্বত্বভোগী চক্র রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় বদলালেও প্রভাব ধরে রাখে। সরকার বদলায়, কিন্তু সুবিধাভোগী চক্রের তৎপরতা বন্ধ না হলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়। শেষ পর্যন্ত এর দায় পড়ে সরকারের ওপর, আর ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অর্থের বিনিময়ে লাভজনক পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে সরকারি চাকরির একটি অংশ জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। কোনো কর্মকর্তা একটি পদে যেতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন—এমন অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে সেই অর্থ তুলে আনার প্রবণতা থেকে ঘুষ ও অন্যান্য অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এভাবে ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া, পদে বসে ঘুষ আদায় এবং সেই অর্থের ভাগ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি দুষ্টচক্র গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন, জবাবদিহি দুর্বল হয় এবং সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দুর্নীতি প্রতিরোধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়নের কথা বলছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ব্যয়ের অপচয় রোধ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগ, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনিয়মের পথও বন্ধ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। ব্যক্তিগত তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা আর্থিক লেনদেনের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতা ও স্বচ্ছ নিয়মের ভিত্তিতে পদায়ন করা গেলে দুর্নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে।
সম্প্রতি সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগ এ আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ভূমি নিবন্ধন খাতের কিছু পদকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও বাণিজ্যিকভাবে আকর্ষণীয় এলাকায় পদায়ন পেতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তবে কোনো সরকারি পদকে আর্থিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা যে প্রশাসনের জন্য ক্ষতিকর, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
লটারি পদ্ধতির মূল সুবিধা হলো, নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মস্থল বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ, তদবির ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ কমানো। তবে এ পদ্ধতি তখনই কার্যকর হবে, যখন লটারিতে অংশগ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, চাকরির মেয়াদ ও পদের উপযোগিতা যাচাই করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া থাকবে স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য। অন্যথায় লটারি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে উঠতে পারে।
সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি প্রশাসনের অন্য ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশ, স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, জনপ্রশাসন, সরকারি ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতে লাভজনক পদে পদায়ন কিংবা পছন্দের কর্মস্থলে বদলি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সবগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কিন্তু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি পদে পদায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যের নিয়োগ ও পদায়ন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ, দায়িত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার জন্য আর্থিক লেনদেনের সুযোগ থাকলে তা পুলিশের পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা ও জননিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জনপ্রশাসনে সচিব পর্যায়ে পদায়ন, জেলা প্রশাসক নিয়োগ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়েও অতীতে বিতর্ক ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। একইভাবে গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব দপ্তরের অনেক কার্যক্রমের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ক্রয় ও ঠিকাদারি ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম থাকলে তা বৃহত্তর দুর্নীতির ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ নীতিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধার কারণে অনেক চিকিৎসক এসব এলাকায় কর্মস্থল পেতে আগ্রহী হন। এ পরিস্থিতিতে বদলি নিয়ে তদবিরের অভিযোগ উঠলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোথাও চিকিৎসকসংকট, কোথাও আবার কর্মস্থলে যোগদান না করার অভিযোগ—এসব সমস্যা কার্যকর বদলি নীতি ও নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। যোগ্যতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করা গেলে শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর পদায়ন প্রক্রিয়ায়ও স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষা অপরিহার্য। বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের সাংবিধানিক অবস্থান ও স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যুক্তিসংগত নয়; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আইনগত কাঠামো, দায়িত্ব ও বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এখানেই লটারি পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। সব পদে কি লটারির মাধ্যমে নিয়োগ বা পদায়ন সম্ভব? বাস্তবতা হলো, সব পদে একই পদ্ধতি কার্যকর হবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিশেষায়িত প্রকৌশলী, জটিল প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা কিংবা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের পদে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক বেশি। এসব পদে যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, সততা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এরপর যেসব ক্ষেত্রে সমযোগ্য একাধিক কর্মকর্তার মধ্যে কর্মস্থল বণ্টন করা প্রয়োজন, সেখানে লটারি একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে।
জেলা প্রশাসক, থানার ওসি, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীর বদলির ক্ষেত্রেও একই নীতিগত কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমে পদভিত্তিক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। এরপর কর্মস্থলের চাহিদা, কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ, বিশেষ দক্ষতা এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় উপযুক্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। একই ধরনের যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে পদায়নের সুযোগ বণ্টনের ক্ষেত্রে লটারি ব্যবহার করলে ব্যক্তিগত তদবিরের সুযোগ কমতে পারে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে লটারির বাইরে পদায়ন করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে নথিভুক্ত ও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণের উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে বিবেচনাযোগ্য। এ ধরনের উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল মূল্যায়ন করে অন্যান্য উপযুক্ত দপ্তরে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তবে শুধু লটারি চালু করলেই দুর্নীতি নির্মূল হবে না। পদায়নের পর কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন, অভিযোগ তদন্ত, সম্পদের হিসাব যাচাই, দায়িত্ব পালনের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সেবাগ্রহীতাদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়নের নীতিমালা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড এবং ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই করতে হলে কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; দুর্নীতি সৃষ্টির সুযোগগুলোও কমাতে হবে। বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ব্যক্তিগত প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এ কারণে স্বচ্ছ নিয়ম, কার্যকর তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ নয়, সরকারি চাকরিতে পদায়নের ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও জনস্বার্থ।
সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতির অভিজ্ঞতা তাই বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কারের একটি পরীক্ষামূলক দৃষ্টান্ত হতে পারে। এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং ফলাফল মূল্যায়নের ওপর। যেখানে পদ্ধতিটি কার্যকর প্রমাণিত হবে, সেখানে তা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা বন্ধ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি চাকরিতে পদায়ন কোনো ব্যক্তির আর্থিক বিনিয়োগের সুযোগ নয়; এটি জনসেবার দায়িত্ব। যে কর্মকর্তা যোগ্যতা ও নিয়ম মেনে পদে যাবেন, তাঁকে যেন কোনো পক্ষের কাছে অনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ হতে না হয়—এমন পরিবেশ তৈরি করাই প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। লটারি সবার জন্য একক সমাধান নয়, তবে যোগ্যতা যাচাই, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে প্রয়োগ করা গেলে এটি বদলি বাণিজ্য কমানো এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।





