মেয়াদ পূর্ণের আগেই ২২ অতিরিক্ত বিচারপতির স্থায়ী নিয়োগ

0
মেয়াদ পূর্ণের আগেই ২২ অতিরিক্ত বিচারপতির স্থায়ী নিয়োগ

লোকসমাজ ডেস্ক: সংবিধান ও দীর্ঘদিনের প্রচলিত বিচারিক প্রথা অনুসরণ না করে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ২২ জন অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উচ্চ আদালত ও আইনাঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া এসব অতিরিক্ত বিচারপতির মধ্যে ২২ জনকে তাঁদের দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিচারাঙ্গনের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অনধিক দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগের বিধান রয়েছে। প্রচলিত রীতি অনুসারে এ সময়কালে সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের বিচারিক দক্ষতা, মামলার নিষ্পত্তির হার, রায় লেখার সক্ষমতা এবং পেশাগত আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়।

পরবর্তীতে তাঁদের কর্মদক্ষতা ও সামগ্রিক বিচারিক কার্যক্রম মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের একাধিক বর্তমান ও সাবেক বিচারপতির সঙ্গে আলাপের ভিত্তিতে জানা গেছে, অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁর লেখা পূর্ণাঙ্গ রায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিতভাবে অন্তত কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ রায় পর্যালোচনার পর প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিরা সংশ্লিষ্ট বিচারপতির বিচারিক দক্ষতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট হলে স্থায়ীকরণের সুপারিশ করেন।

এ ছাড়া কোনো বিচারপতির কর্মদক্ষতা নিয়ে সংশয় থাকলে তাঁর অতিরিক্ত বিচারপতির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ না হলে স্থায়ী নিয়োগ না দেওয়ার নজিরও অতীতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগে ২৩ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ পান। এর প্রায় এক বছর এক মাস পর, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর তাঁদের মধ্যে ২২ জনকে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে তাঁদের দুই বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্থায়ী নিয়োগ কার্যকর হয়।

অন্যদিকে, ওই সময়ে স্থায়ী নিয়োগ না পাওয়া একজন অতিরিক্ত বিচারপতির মেয়াদ প্রথমে বাড়ানো হয়। পরে ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকেও স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এক বছর এক মাসের মাথায় স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ২২ বিচারপতির মধ্যে কয়েকজন স্থায়ীকরণের আগে কোনো পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় দেননি। এ বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে বিচারাঙ্গনে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের একাংশ জানতে চেয়েছেন, দুই বছরের প্রচলিত পর্যবেক্ষণকাল পূর্ণ হওয়ার আগেই স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হলে বিচারিক দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায় না থাকার অভিযোগের মধ্যেও স্থায়ী নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি আইনাঙ্গনের একটি অংশে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রচলিত বিচারিক রীতি ও দীর্ঘদিনের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এমনকি এ বিষয়ে রিট আবেদন বা অন্য ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে তাঁদের অভিমত।

তবে সংশ্লিষ্ট ২২ বিচারপতিকে কোন প্রক্রিয়া ও কী ধরনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের আগেই স্থায়ী করা হয়েছে, সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি উচ্চ আদালত ও আইনাঙ্গনের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।