বেনাপোলে গ্রেফতার কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত যশোরের বুনো আসাদ হত্যা মামলায় আসামি

0

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ : বেনাপোলে কাস্টমসের গোডাউন থেকে মালামাল চুরি ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরের উদ্দেশ্যে পাঠানো গাড়িতে করে তা পাচারের ঘটনায় আটক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত মুখার্জী যশোরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী আসাদুজ্জামান ওরফে বুনো আসাদ হত্যা মামলার আসামি। যশোর শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ তার মহল্লায় উৎপল ও কানু নামে পরিচিত। যে বুনো আসাদের হাত ধরে তার বেড়ে ওঠা সেই আসাদের এক সময় বড় প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। স্থানীয়রা জানান, ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী ওরফে কানু কাস্টমসে চাকরি পাওয়ার পর বছর না যেতেই বিত্তশালী হয়ে উঠতে শুরু করেন। এবং মহল্লায় বুনো আসাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে মন্দিরের পদ ও জোর করে বাড়ি কিনে নেওয়ার অভিযোগ করেন এলাকার মানুষ।

রোববার দিবাগত রাত ২টার দিকে যশোরের বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদাম থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডারে পাঠানো পণ্যের সাথে চোরাই মালামাল পাচারের সময় বিজিবি তা আটক করে। এ ঘটনায় সে সময় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া আটক কর্মকর্তাসহ বেনাপোল কাস্টমস হাউস দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

গতকাল বেনাপোল কাস্টমস কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময় ঘোষণা বহির্ভূত ও অবৈধ পণ্য আটক ও বাজেয়াপ্তের পর তা কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদামে রাখা হয়। সেখান থেকে ৮৮৪পি নারী ও পুরুষের পোষাক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল বরাবর পাঠানো হচ্ছিল। রোববার দিনে বোনাপোল কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার সাঈদ আহমেদ রুবেলের উপস্থিতিতে একটি কার্গো ট্রাকে উঠানো হয়। এরপর তিনি সেগুলো সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরীকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান।

৮শ৮৪টি পোশাক সামগ্রীর মধ্যে ছিল ৬৪৮টি শাড়ি, ১০৩টি চাদর, ৭১টি থ্রি-পিস এবং ৬২টি লুঙ্গি। এ সংক্রান্ত একটি দাপ্তরিক চিঠি থেকে জানা যায় গুদাম কর্মকর্তা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এগুলো রাজধানীতে সংশ্লিষ্ট দফতরে পৌঁছে দেবেন।

এদিকে উল্লিখিত মালামালবাহী আহাদ পার্শেলের কার্গো ট্রাকটি রোববার দিবাগত রাতে যখন ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়  তখন বেনাপোল বাজারে বিজিবি সেটি আটক করে তাদের বিওপিতে নিয়ে যায়।

যশোরের ৪৯ বিজিবির অধিনায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান মঙ্গলবার রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তি জানান, তাদের কাছে গোপন খবর ছিল ওই কার্গো ট্রাকে অবৈধ মালামাল বহন করা হচ্ছে।

একই সাথে ওই রাতে বিজিবি বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিত মুখার্জী এবং ট্রাকের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসানকে আটক করে।

সোমবার সারাদিন বিজিবির বেনাপোল বিওপিতে আটক কার্গো ট্রাক থেকে উদ্ধার মালামালের তালিকা করে রাত ১০টার পর গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেন বিজিবি অধিনায়ক।

ওই বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায় ট্রাকের ভিতর থেকে ভারতীয় ৬ হাজার ৮টি শাড়ি, ৬৩টি থ্রী-পিস, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং ৩৩ হাজার ২২২টি বিভিন্ন প্রকার প্রসাধন সামগ্রী পাওয়া যায়। অর্থাৎ বিজিবির উদ্ধার করা ৩৯ হাজার ৮৯৫টি পণ্যের মধ্যে মাত্র ৮৮৪টি পণ্য বৈধ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে গাড়িতে ছিল। বাকিগুলো অবৈধ এবং তা বেনাপোল কাস্টমসের নিলাম গুদাম থেকে চুরি করা।

এ ঘটনা ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে বেনাপোল স্থল বন্দরে। ঘটনার অনুসন্ধানে সিসিটিভির ভিডিওচিত্র পর্যবেক্ষণ করে কাস্টমস কর্মকর্তারা দেখতে পান অবৈধভাবে পণ্য কার্গো ট্রাকে তোলার সময় সেখানে গুদাম কর্মকর্তা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, অপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী এবং সিপাহী মো. হামিদুর রহমান, জামসেদ রহমান ও মো. সাগর উপস্থিত রয়েছেন। এসময় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দুইজন এআরও ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল কাস্টমসে চোরাই মালামাল কেলেঙ্কারি
আসাদুজ্জামন ওরফে বুনো আসাদ- সংগৃহীত ছবি

এদিকে এ ঘটনা গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে যশোর শহরের বেজপাড়া বুনোপাড়ায় আলোচনার জন্ম দেয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইন্দ্রজিত মুখার্জী নামে যে কর্মকর্তা আটক হয়েছেন তিনি তাদের পাড়ার কানু ওরফে উৎপল। অতি সাধারণ পরিবারের পিতৃহারা কানুর এক বোন রয়েছেন। তিনি যশোরের নোভা হসপিটালে চাকরি করেন। তার পিতার খবর কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে তার মা অন্য ধর্মের এক জনকে বিয়ে করে চলে যান। এরপর থেকে নানা বাড়িতে বেড়ে ওঠেন কানু ও তার বোন। কানু বিভিন্ন সহায়তায় পড়া লেখা করেন। তার অন্যতম সহায়ক ছিলেন সন্ত্রাসী হিসেবে কুখ্যাত আসাদুজ্জামান ওরফে বুনো আসাদ। কিন্তু কাস্টমসে চাকরি পেয়ে বিত্তশালী হয়ে ওঠার সাথে সাথে আচরণ বদলে অহংকারী হয়ে ওঠেন কানু ওরফে ইন্দ্রজিত। অসম্মানিত বোধ করেন। ২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্দ্রজিতের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের ব্যাপারে অভিযোগ করেন। এরপর একই বছরের ৮ নভেম্বর হামলার শিকার হন আসাদ। ২১ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আসাদের।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বাদি আসাদের ভাই সাহিদুর রহমান অভিযোগ করেন, দুর্নীতি দমন কমিশনে করা অভিযোগটি প্রত্যাহারের জন্য আসাদকে চাপ প্রয়োগ করেন ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী। কিন্তু রাজি না হওয়ায় একই বছরের ৪ নভেম্বর ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীসহ অন্য আসামিরা আসাদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ৮ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে এলাকার সাদেক দারোগার মোড়ে ওষুধ কিনতে গিয়েছিলেন আসাদ। এ সময় ইন্দ্রজিতের হুকুমে সাদেক দারোগার মোড়ের নুরুন্নাহার হোমিও হলে আসামিরা আসাদকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত, কিল ও ঘুষিসহ মারপিট করে।

এর মধ্যে আসাদুজ্জামানের ছোট ভাই সাহিদুর রহমান ইন্দ্রজিতসহ ৪ জনের নাম উল্লেখসহ অপরিচিত ৫/৭ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় হত্যা চেষ্টা মামলা করেন। ২১ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসাদ মারা যান। তদন্ত শেষে হত্যার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় ইন্দ্রজিতসহ তিনজনকে অভিযুক্ত এবং চঞ্চল ও আকাশের অব্যাহতি চেয়ে পুনরায় চার্জশিট দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।