হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি পরিবর্তন ও ইউনিসেফের সতর্কবার্তা

0
ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া ।। ছবি: সংগৃহীত

টিকাদানের ক্ষেত্রে সফল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশে হামে এত সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, এই সংকটের মূলে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের অপরিকল্পিত ক্রয়নীতি পরিবর্তন, অর্থছাড়ের বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার আগাম সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করার সম্মিলিত প্রভাব।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফ একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে এবং সময়মতো মানসম্মত টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। তবে ২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করেই এই সফল প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে ৫০ শতাংশ টিকা ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি’ বা ওপেন টেন্ডার মেথডে (OTM) কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইউনিসেফ তখনই সরকারকে লিখিতভাবে সতর্ক করেছিল যে, এই নতুন পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করতে অন্তত ১২ মাস সময় লাগতে পারে, যা টিকার মজুতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করবে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বহাল রাখা হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সরকার সময়মতো দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেনি এবং ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করেনি। ফলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৬ সালের শুরুতে দেশে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়।

সরকার অর্থছাড় না করলেও শিশুদের সুরক্ষায় ইউনিসেফ নিজস্ব ‘প্রিফাইন্যান্সিং’ ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার আগাম অর্থায়ন করে টিকার সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করে। এই পদক্ষেপের কারণে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেওয়া গেলেও, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে অনেক জীবনরক্ষাকারী টিকার মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশে হামের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই। কিন্তু সরকারের রোগ নজরদারি ও প্রতিবেদন ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে, প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত তথ্য প্রকাশে প্রায় তিন মাস বিলম্ব হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রাদুর্ভাবের তথ্য পায় মার্চের শেষ দিকে। ততদিনে সংক্রমণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানান, ইউনিসেফ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় টিকা সংগ্রহ করে রেখেছিল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সাড়া ও সবুজ সংকেত না পাওয়ায় গণটিকাদান বা ক্যাম্পেইন শুরু করতে বিলম্ব হয়। শেষ পর্যন্ত ৫ এপ্রিল থেকে এমআর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন শুরু করা সম্ভব হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে মার্চের শেষ দিকে বিতর্কিত ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি’ বাতিলের নির্দেশ দেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এপ্রিলে সরকার পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের সফল পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহে ফিরে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বাংলাদেশে হামের এই পুনরাগমন কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং এটি নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার একটি বড় উদাহরণ। ইউনিসেফ বারবার আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করলেও তৎকালীন নেতৃত্বের উদাসীনতার মাসুল দিতে হচ্ছে হাজারো শিশুকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত টিকা সংগ্রহে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম, বাংলাদেশের এই বর্তমান সংকট অন্য দেশগুলোর জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।