লাশহীন এক তদন্তে খুনের রহস্যভেদ: কুয়াকাটায় হোটেল কক্ষে হত্যার পর সাগরে ফেলা হয় লাশ

0
বক্স খাটে রাখা ছিল লাশ, পুলিশ পায়নি; হোটেলের সুনাম রক্ষায় মৃতদেহ সাগরে ফেলে মালিকপক্ষ ।। প্রতীকী ছবি: এআই/লোকসমাজ

‘ভারতে যাচ্ছি, দোয়া করবেন’—মুঠোফোনে বাবার কাছে এটিই ছিল মার্জিয়া কান্তার শেষ কথা। এরপর আর ফেরেননি তিনি। মেয়ের খোঁজ নিতে জামাতার কাছে গেলে উত্তর আসে—ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন কান্তা। কিন্তু কোথায় সেই দুর্ঘটনা আর কোথায় লাশ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই উন্মোচিত হয় এক রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কাহিনী। ভারতে নয়, কান্তাকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছিল পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার এক হোটেল কক্ষে।

নরসিংদীর মেয়ে মার্জিয়া কান্তা ঢাকার আশুলিয়ায় বিউটি পারলার চালাতেন। সেখানেই পরিচয় ও প্রেম থেকে বিয়ে হয় শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তবে শহিদুল তাঁর প্রথম বিয়ের কথা গোপন করেছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কান্তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন শহিদুল। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি।

ঘটনার চার মাস পর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি কান্তার বাবা নরসিংদীর আদালতে একটি অপহরণ মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই (PBI)। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, কান্তা ভারতে যাননি। নিখোঁজের দিন শহিদুল ও তাঁর বন্ধু মামুনসহ কান্তা শরীয়তপুরের একটি হোটেলে ছিলেন। পরে তাঁরা সেখান থেকে কুয়াকাটায় চলে যান।

তদন্তে আরও জানা যায়, ২১ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরে হত্যার পরিকল্পনা থাকলেও নিজের আসল নাম ব্যবহার করায় পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন শহিদুল। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটার ‘হোটেল আল মদিনা’য় ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কক্ষ ভাড়া নেন তাঁরা। সেখানে কান্তাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ বক্স খাটের ভেতরে লুকিয়ে রেখে পালিয়ে যান শহিদুল ও মামুন।

হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর কক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে এক কর্মচারী বক্স খাটের ভেতরে লাশটি দেখতে পান। কিন্তু হোটেলের সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে মালিক ও কর্মচারীরা পুলিশকে না জানিয়ে লাশটি গুম করার সিদ্ধান্ত নেন। রাতের আঁধারে মোটরসাইকেলে করে লাশ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের গভীর পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এর আগে পুলিশ কক্ষটি তল্লাশি করলেও বক্স খাটের ভেতর লাশের সন্ধান পায়নি।

এই মামলায় কোনো লাশ ছিল না, ছিল না ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বা সরাসরি কোনো সাক্ষী। পিবিআই-এর জন্য এটি ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রযুক্তিগত তথ্য, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ এবং আসামিদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ২০২১ সালে আদালত এই মামলার ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন:

দণ্ডিত খুনি শহিদুল ইসলাম (বাঁয়ে) ও মামুন মিয়া।। ছবি: সংগৃহীত

শহিদুল ইসলাম (স্বামী): আমৃত্যু কারাদণ্ড।

মামুন মিয়া (সহযোগী): যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

হোটেল মালিক ও ব্যবস্থাপক: লাশ গুম ও আলামত নষ্টের দায়ে ৩ জনকে ৭ বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা।

সম্প্রতি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে এই তদন্তকে ‘লাশহীন হত্যায় বিচার নিশ্চিতের অনন্য উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, সঠিক প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং নিষ্ঠার মাধ্যমে মৃতদেহ ছাড়াই অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব, কান্তা হত্যাকাণ্ড যার এক বড় প্রমাণ।