সমঝোতায় চাপা পড়ছে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের ‘কথিত ক্রসফায়ার’ মামলা

0

মীর মঈন হোসেন মুসা ।।  বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন আমলে যশোরে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা কথিত ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা, গুলি করে পঙ্গু করা এবং গুমের ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাছে সেই দিনগুলি ছিল ভয়ঙ্কর ও দুঃস্বপ্নের।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে আদালতে ও থানায় অন্তত অর্ধশত মামলাও হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব মামলা দফারফার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীরাই এখন উল্টো অভিযুক্ত সেই পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মামলা থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন বা মামলা নিষ্পত্তি করে দিচ্ছেন এমন তথ্য মিলেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ ও র‌্যাবকে অপব্যবহার করেছেন। এরই সুযোগ নিয়ে তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর নিপীড়ন চালানোসহ কথিত নাশকতার মামলা, কথিত ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা, গুলি করে পঙ্গু করা, ধরে এনে গুম করার ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অসৎ পুলিশ কর্মকর্তারা।

যশোরেও সেই সময়কার ভয়ঙ্কর দিন কাটিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ। পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান যশোরে কর্মরত থাকাকালীন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে এই অর্থবাণিজ্যের রেকর্ড ভেঙেছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের দুঃশাসনের অবসান ঘটে। এরপর পুলিশের কথিত ক্রসফায়ারের নামে হত্যার শিকার মানুষের পরিবার এবং পঙ্গুসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতিত ভুক্তভোগী অথবা তাদের স্বজনেরা আইনের আশ্রয় নিতে যশোরের আদালতের দ্বারস্থ হন।

তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, ওসি অপূর্ব হাসান, ওসি ছয়রুদ্দিন (বর্তমানে সহকারী পুলিশ সুপার), এসআই জামাল হোসেন, এসআই শোয়েব উদ্দিন আহমেদ, এএসআই মাসুদুর রহমান (বর্তমানে এসআই) সহ অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের শুরু করেন।

এসব মামলা আমলে নিয়ে কোনোটা থানায় রেকর্ড এবং কোনোটা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আদেশ দিয়েছিলেন সংশি¬ষ্ট আদালতের বিচারকেরা।

যশোর আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মোছা. রোকসানা খাতুন জানান, আদালতে এ সংক্রান্ত ৪৮/৪৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত অর্ধেক মামলা আদালতের আদেশে সংশি¬ষ্ট থানায় রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কোতোয়ালি থানার ইনসপেক্টর (তদন্ত) কাজী বাবুল হোসেন জানান, কোতোয়ালি থানায় ১১টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। মামলাগুলি তদন্তাধীন রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনজীবী ও পুলিশের কয়েকটি সূত্র জানায়, অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য তারা নানাভাবে দেনদরবার চালিয়ে আসছেন। মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব দিচ্ছেন বাদীপক্ষকে।

ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলার বাদী আইনজীবীর মধ্যস্থতায় টাকার বিনিময়ে অ্যাফিডেভিট করে দিয়েছেন। তবে অ্যাফিডেফিড করে দেওয়া মামলাগুলি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইনজীবী জানান, একটি মামলার আসামি পক্ষ বাদীকে নগদ টাকার পাশাপাশি ১টি ইজিবাইকও কিনে দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, কোনো কোনো ঘটনার বিষয়ে আদালতে মামলা দায়েরের আগেও লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে আপস করে নিয়েছেন ভুক্তভোগী অথবা তার স্বজনেরা। মামলা করার প্রস্তুতির আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রথমে জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হচ্ছে। মামলার আরজি লেখা হয়ে গেছে। এরপর ওইসব পুলিশ কর্মকর্তা ভুক্তভোগীর আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়েরের আগেই টাকা দিয়ে আপস করে নিয়েছেন।

সর্বশেষ গত ৩১ জুলাই পুলিশের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার আপস হয়ে যাওয়ায় আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ওই মামলার বাদী বাঘারপাড়া উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামের মৃত নেছার আলী বিশ্বাসের ছেলে আবু ইসা।

এটিই প্রথম মামলা, যা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হলো বলে জানিয়েছেন বাদীর আইনজীবী রুহিন বালুজ। আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বর্ণালী রাণী তাঁর আদেশে উল্লেখ করেছেন, বাদী আবু ইসা আদালতে হাজির হয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য দরখাস্ত করেন। আসামিদের সাথে অভিযোগকারীর স্থানীয়ভাবে আপস মীমাংসা হয়েছে। তিনি এখন মামলা চালাতে ইচ্ছুক নন। বাদীর দরখাস্তটি বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাহার করা হলো।

আবু ইসাকে পঙ্গু করার অভিযোগের ওই মামলার আসামিরা ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য রনজিৎ রায়, পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার খ-সার্কেল রফিকুল ইসলাম, বাঘারপাড়া থানার ওসি ছয়রুদ্দিন আহমেদ, এসআই এস কে আই সোহাগ, রায়পুর পুলিশ ক্যাম্পের এসআই হান্নান শরীফ, খাজুরা পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই মাসুদুর রহমান, এএসআই শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু তালেব, সেলিম হোসেন, আবু সাঈদ, মাহাবুব আলম, নলডাঙ্গা গ্রামের ইউনুস, বাকু বিশ্বাস ও কষ্ণনগর গ্রামের সালাম মণ্ডল।