যবিপ্রবিতে অবহেলায় পড়ে আছে ভিত্তিপ্রস্তরের নাম ফলক, মর্যাদায় ফ্যাসিবাদের স্মৃতি !

0

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ, নভেম্বর ২৫ ॥ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর স্বপ্নদ্রষ্টা যশোরের প্রাণপুরুষ তরিকুল ইসলাম। জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের বিদায়ের তিন মাস পরেও এ দুটি নাম পায়নি মর্যাদা। বরং প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্বোধনকৃত ভিত্তিপ্রস্তরটি আজও পড়ে আছে অযত্ন অবহেলায়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরতে পরতে প্রদর্শিত হচ্ছে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নাম। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, রিজেন্ট বোর্ড পুনর্গঠন না হওয়ায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। তবে খুব দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
পতিত শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের অন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) প্রশাসনে শীর্ষ পদে পরিবর্তন হয়েছে। আলোচিত ভিসি প্রফেসর ড. মো. আনোয়ার হোসেনের স্থলে উপাচার্য হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মজিদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হাল ধরলেও এসব পরিবর্তনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা মেলেনি এখনো।
২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার প্রথম ও একমাত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যবিপ্রবির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই ভিত্তিফলকটি গত প্রায় ১৮ বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও নেই স্বপ্নদ্রষ্টা তরিকুল ইসলামের নাম।

জননেতা তরিকুল ইসলাম

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যবিপ্রবিতে এখন পর্যন্ত যে কয়টি হল, একাডেমিক ভবন ও গবেষণা কেন্দ্র আছে তার প্রায় সিংহভাগই পতিত শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে। এরমধ্যে মেয়েদের একটি হলের নাম স্বয়ং শেখ হাসিনার নামে রয়েছে। এর বাইরেও উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটটি তার স্বামী প্রয়াত ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে। আর অ্যাকাডেমিক ভবনটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। একমাত্র জিমনেশিয়ামটির নামকরণ করা হয়েছে শেখ হাসিনার ছোট ভাই শেখ রাসেলের নামে।

এছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি সংগঠনের নামও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের পুরোধা শেখ মুজিবের নামে। এগুলো হলো- বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ব্লাড ডোনেশন ক্লাব, বঙ্গবন্ধু ক্যারিয়ার ক্লাব প্রভৃতি।
যশোরের সাহিত্যিক ও সংগঠক ড. মহিউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের পূজাই ছিল গত দেড় দশকে সকল স্তরে। ঐতিহ্যের যশোরে অসংখ্য প্রথিতযশা রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থাকলেও তাঁদের নামে নেই কোন কিছু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
তিনি বলেন, যশোরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মুন্সি মেহেরুল্লাহ থেকে শুরু করে গ্রন্থগার আন্দোলনের পথিকৃৎ অধ্যাপক শরিফ হোসেন, পঞ্চাশ দশকের অন্যতম কবি আজীজুল হক, সাহিত্যিক হোসেন উদ্দিন হোসেন, প্রখ্যাত জ্যোতিষবিদ রাধা গোবিন্দ চন্দ্র, সাহিত্যিক ধীরাজ ভট্টাচার্য্য ও মনোজমিত্রের মতো মহামনীষিরা রয়েছেন। এছাড়া বিট্রিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরোচিত ভূমিকা রেখে সারা দেশে পরিচিতি রেখেছেন এমন অনেক মানুষ রয়েছে ঐতিহ্যের এ জেলায়। তাদেরকে মূল্যায়ন করা উচিৎ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নামকরণের ক্ষেত্রে।
এদিকে শেখ হাসিনার পতনের তিন মাসেরও অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও এসব স্থাপনা ও নামের ফলক অপসারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় সচেতন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিএনপি সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখনও পর্যন্ত স্বৈরাচারের পরিবারের নামে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রধান ফটকের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক স্থানান্তর করা হয়। সেই বন্ধ ফটকের পাশে নির্মিত একটি সাইকেল গ্যারেজে বেগম খালেদা জিয়ার স্থাপন করা ভিত্তিফলকটি এখনও অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। যদিও সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আব্দুল মজিদ খালেদা জিয়ার নামে ফলকটি উদ্ধার করে সেটি যথাযত স্থানে স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে, যশোরের গণমানুষের প্রাণপুরুষ প্রয়াত তরিকুল ইসলামের একান্ত প্রচেষ্টায় যশোরে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। এরপর বিএনপি সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যশোরের মানুষের বহুল প্রত্যাশিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর উদ্বোধন করেন। তবে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার ও সরকারি দলের আশীর্বাদপ্রাপ্তির আশায় নামকরণের ক্ষেত্রে শুধুই এক পরিবারের সদস্যদের কথা বিবেচনা করেছেন সুবিধাবাদী মহল।
বিগত ১৬ বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদী বিরোধী কোনো মতাদর্শের সংগঠনকে স্থান দেয়া হয়নি। ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকদের কোনো প্লাটফরম যবিপ্রবিতে নেই। ফলে নীল দলের ব্যানারে এই ক্যাম্পাসে ফ্যাসিবাদ সমর্থক শিক্ষকরা সংগঠিত হয়ে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। যা জুলাই বিপ্লবের পরও এখনও পরতে পরতে বিদ্যমান রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। সরকার পতনের পর ফ্যাসিবাদী শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. ইকবাল কবির জাহিদ ক্যাম্পাস ছেড়ে গেলেও তার অনুসারী এখনো রয়ে গেছেন। তাদের আধিপত্য ও দাপট কোনোটাই কমেনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, এসব বিষয়ে রিজেন্ট বোর্ডের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রিজেন্ট বোর্ড পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আশা করা যায় আগামী সপ্তাহের মধ্যে মধ্যে রিজেন্ট বোর্ড গঠন হয়ে গেলে এ ব্যাপারে আমরা কাজ শুরু করতে পারবো। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সব মহল থেকে দাবি আসছে। ফলে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য যাদের অবদান রয়েছে তাদেরকেও যথযাথ সম্মান ও স্বীকৃতি দেয়া হবে। এর বাইরে আরও অনেক কিছু সংস্কার করা হবে।