বেপরোয়া সিন্ডিকেটের দখলে ঈদ বাজারের চিনি

0

শেখ আব্দুল্লাহ হুসাইন ॥ ঈদ বাজারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চিনি সিন্ডিকেট। সরকার দাম কমালেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের। আবার জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন বাজার। বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পেছনের পথে বেশি দামে বিক্রি করে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা।
যশোরের বড়বাজারে আমদানি করা খোলা চিনি প্রতি কেজি খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা। অথচ সরকার কেজিতে আরও ৩ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করেছে খোলা চিনি ১০৪ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনি ১০৯ টাকা। যশোরের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা বলছেন বেশি দাম নেওয়ার অপরাধে দোকানিদের জরিমানা করে চলে আসার পরই আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে তারা।
চিনির দাম কমালেও বাজারে না কমার এ ধারা নতুন নয়। স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রীও দাম না কমে বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করে দায়সারা বক্তব্য দিয়েছেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি রোববার (১৬ এপ্রিল) গণমাধ্যমে বলেন, আমরা সম্প্রতি লক্ষ্য করেছি চিনির দাম একটু ঊর্ধ্বমুখী। আমরা বলেছিলাম চিনির দাম পাঁচ টাকা কমানো হোক। পরবর্তীকালে হিসাব-নিকাশ করে দেখা যায় তিন টাকা ৫০ পয়সা কমানো যায়। যখনই এটা আলোচনা চলছিল তখনই চিনির দাম আবার বাড়ানো হয়। রমজানের শেষ দিকে ঈদ ঘিরে চিনির চাহিদা বেড়েছে। যে কারণে দামও বেড়েছে। দাম যে বেড়েছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
চিনি নিয়ে দীর্ঘদিনের ছিনিমিনি খেলা চলছেই। ঈদের বাড়তি চাহিদাও কোম্পানিগুলোর বাড়তি মুনাফার একটি কৌশল। জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছেন। মিলমালিকদের দাবি, তারা সরকার নির্ধারিত দামে মিলগেটে চিনি বিক্রি করছেন, সেটা বাজারে নিয়ে বাড়তি দামে বিক্রি করছেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা।
বিক্রেতারা বলছেন, মিল থেকে ইনভয়েসে সরকার নির্ধারিত দাম নেওয়া হলেও আন্ডার ইনভয়েস বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে। বেশি দামে কেনা বলেই তারা বাধ্য হয়ে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
সব মিলে দেশের চিনির বাজার এখনো অস্থিতিশীল। শুধু দাম কমানো নয়, ২৬ ফেব্রুয়ারি চিনি আমদানিতে যে শুল্ক প্রত্যাহার হয়, তারও কোনো সুফল মিলছে না। ওই সময় আমদানি করা অপরিশোধিত চিনির ওপর থেকে কেজিপ্রতি সাত টাকা এবং পরিশোধিত চিনি থেকে ১০ টাকা শুল্ক প্রত্যাহার হয়। এরপর সরকার প্রতি কেজি চিনিতে আরও ৩ টাকা দাম কমিয়ে আমদানি করা খোলা চিনির খুচরা মূল্য ১০৪ টাকা ও প্যাকেটজাত চিনির কেজি ১০৯ টাকা নির্ধারণ করেছে। যা গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ।
বুধবার (১৯ এপ্রিল) যশোরের বড়বাজারে গোহাটা রোডে পাইকারি চিনি ব্যবসায়ী হাজি আলী স্টোরে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনি ৫ হাজার ৮৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনির প্ইাকারি মূল্য পড়ল ১১৭ টাকা। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মুস্তাক আহাম্মেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, মিল থেকে চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। আরও পাওয়া গেলেও যশোরে এক বস্তা চিনি আনতে খরচ পড়বে ৫ হাজার ৯২৫ টাকা। এ কারণে তিনি চিনি আনেননি। তার কেনা চিনি আগের দামে বিক্রি করছেন।
এদিকে বুধবার বড়বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা দোকানিরা তাদের পণ্য মূল্যের তালিকায় চিনির কেজি ১২০ টাকা লিখে রেখেছেন। লক্ষ্য করা গেছে অপরিচিত লোকের কাছে দোকানিরা চিনি বিক্রি করছেন না। আর ১২০ টাকা মূল্য তালিকায় থাকলেও বেশি দাম নিচ্ছেন তারা। শহরের চুড়িপট্টির বাসিন্দা শেখ মতিয়ার রহমান কুরবান  এক কেজি আমদানি করা খোলা চিনি কিনেছেন ১৩০ টাকায়। বড়বাজার মাছবাজারে অবস্থিত ‘টনি স্টোর’ দোকান থেকে তিনি চিনি কিনেছেন। খুচরা দোকানিদের কাছে পাইকারি চিনি কেনার কোনও রশিদ নেই। দোকানিরা বলছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা রশিদ ছাড়াই তাদেরকে চিনি কিনতে বাধ্য করছেন।
ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, চিনি আমদানিকারক ও মিল মালিকরা অতি মুনাফালাভের আশায় রমজানে রোজাদারদের জিম্মি করে দেশে চিনির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন। গত তিন মাসে সরকার দু দফা চিনির খুচরা ও পাইকারি বিক্রি মূল্য নির্ধারণ এবং সম্প্রতি আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করার পরও ব্যবসায়ীরা চিনির দাম বাড়িয়ে চলেছেন। আরও জানা গেছে মিল গেটের বাইরে পেছনের পথে বেশি দাম দিলে চিনি সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
বুধবার জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের যশোর জেলা সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ওয়ালিদ বিন হাবিব জানান, তিনি খুলনায় বদলি হওয়াতে যশোরে বেশি সময় দিতে পারছেন না। বুধবার কথা হয় যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের সাথে। তিনি লোকসমাজকে জানান, বুধবারও তিনি শহরের এইচ এম এম রোডে সজিব স্টোরের স্বত্বাধিকারী সজিবকে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দাম ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রির অপরাধে ২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। তিনি আরও জানান, জারিমানা করে চলে আসার পরপরই দোকানিরা আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। লোকবল কম থাকায় পুরোপুরি ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।