যশোরে সংগ্রহ হয়নি এক কেজি আমনও লোকসানের ভয়ে চাল দিচ্ছেন না মিলার

0

আকরামুজ্জামান ॥ গত ১৭ নভেম্বর থেকে চলতি মৌসুমের যশোর জেলার আমন সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে দীর্ঘ এই ২৪ দিনেও এক কেজি ধানও সংগ্রহ করতে পারেনি খাদ্য বিভাগ। রবিবার পর্যন্ত জেলায় মাত্র ৮০ মেট্রিক টন মোটা চাল সংগ্রহ হয়েছে। কৃষক ও মিল মালিকরা বলছেন, বাজারে ধান ও চালের দাম সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি হওয়ায় তারা সরকারি গুদামে ধান ও চাল বিক্রিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। চুক্তিবদ্ধ হওয়া মিলাররা চাল দেয়া নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে যশোর জেলায় আমন সংগ্রহ সফল না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জেলা খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোর জেলার আমন সংগ্রহ অভিযানে ১৪ হাজার ৯৯৭ মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এরমধ্যে ধান ৪ হাজার ৯৯৮ ও ৯ হাজার ৯৯৯ টন সিদ্ধ চাল। কেজিপ্রতি ধানের দাম ২৮ টাকা ও চালের দাম ৪২ টাকা ধরা হয়। ১৭ নভেম্বর থেকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ অভিযান চলবে।
রবিবার বিকেলে জেলা খাদ্য অধিদপ্তরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সংগ্রহ অভিযানের ২৪ দিন পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত জেলার ৮ উপজেলার কোনো খাদ্য গুদামে এক কেজি ধানও সংগ্রহ হয়নি। শার্শা উপজেলা ৮০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। ধান ও চালের বর্তমান বাজার দরের ব্যাপক পার্থক্য থাকায় এ পরিস্থিতি বলে খাদ্য বিভাগের লোকজন দাবি করছেন।
জেলা খাদ্য অফিসের প্রধান সহকারী (প্রশাসন ও সংগ্রহ) উজ্জল কুমার দাস বলেন, ইতোমধ্যে যশোর জেলার ৮ উপজেলায় মোট ৫৯ জন মিলার খাদ্য অফিসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এরমধ্যে শার্শা উপজেলায় ২১ জন, সদরের ৬ জন, অভয়নগরের ১ জন, কেশবপুরে ৭ জন, ঝিকরগাছায় ৬ জন, চৌগাছায় ১১ জন ও মণিরামপুরে ৭জন মিলার রয়েছেন। তবে বাঘারপাড়া উপজেলায় এখনও পর্যন্ত কোনো মিলার চুক্তিবদ্ধ হননি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত জেলার শার্শা থেকে ৮০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। আশা করা যায় সামনে আরও মিলার চুক্তিবদ্ধ হবেন।
এদিকে খাদ্য অফিসের সাথে মিলাররা চুক্তিবদ্ধ হলেও তারা বেশি দামে ধান-চাল কিনে খাদ্য গুদামে বিক্রি করতে একেবারেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে তারা জানান। তাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে সরকারের বেঁধে দেয়া দরে ধান-চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে তারা লোকসান গুনে আসছেন। এ বছর তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি। বর্তমান বাজারর দর ও সরকার নির্ধারিত দামের বিস্তর ফারাক থাকায় তারা চাল দেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। চুক্তিতে আসার মতো অনেক যোগ্য মিলার এখনও পর্যন্ত সাড়া দিচ্ছেন না খাদ্য বিভাগের আহবানে। তবে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের আশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তালিকাভুক্ত মিলাররা চুক্তিতে আসবেন।
এ বিষয়ে যশোর খাদ্য অফিসের সাথে চুক্তিবদ্ধ মিলার এসকে অটো রাইস মিলের নজরুল ইসলাম বলেন, বাজারে ধান ও চালের দামের সাথে সরকার নির্ধারিত দামের কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় এ বছর আমরা চাল দিয়ে লাভ করতে পারবো কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। তারপরও লাইসেন্স রক্ষার জন্যে আমাদেরকে চাল দিতে হবে। তবে আমাদের দাবি, সরকার যেনো বাজারের ধান চালের দামের সাথে আমাদের মিলারদের নির্ধারিত দামের সমন্বয় করে দাম পুনর্নির্ধারণ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মিলার বলেন, আমরা এখন উভয় সংকটে আছি। সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ধান কিনে আগের দুই বছর আমাদের সরবরাহ করতে হয়েছে। এতে প্রচুর লোকসান গুনতে হয়েছে। এবারও একই অবস্থা। তারপরও আমাদের লাইসেন্স রক্ষা করতে গিয়ে জেনেশুনেই আগুনে ঝাঁপ দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললে আগামীতে আর খাদ্য বিভাগ থেকে কোনো চুক্তি করবেনা বলে অনেক মিলার কথা বলছেন না বলে তিনি দাবি করেন।
একই অবস্থা কৃষক পর্যায়েও। বাজারে ধানের দামের চেয়ে সরকার নির্ধারিত দাম কম হওয়ায় কৃষকরা ধান দিতে একেবারেই আগ্রহ হারিয়েছেন। জেলার সদর উপজেলার মনোহরপুর এলাকার কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, যশোরাঞ্চলের কৃষকরা মূলত চিকন ধানের চাষ করেন। এসব ধানের বর্তমান বাজার দর ১২ থেকে ১৩শ টাকা। এরআগে ধান ক্ষেত থেকে ঘরে তোলার সময় আরও বেশি দাম ছিলো। যে কারণে কৃষকরা বাজারে ধান বিক্রি করে দিয়েছে। সে কারণে খাদ্য গুদামে ধান বিক্রিতে কোনো কৃষকের আগ্রহ নেই বলে তিনি দাবি করেন।
জেলার বাঘারপাড়ার ধান ও চাল ব্যবসায়ী আমিনুর রহমান ও নিজাম উদ্দীন বলেন, কেজিপ্রতি চাল উৎপাদনে তার খরচ হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা। এ অবস্থায় সরকারের নির্ধারিত ৪২ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি করলে তাদের পথে বসতে হবে। যে কারণে অধিকাংশ মিলাররা খাদ্য অধিদপ্তরের সাথে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন না বলে এই দুই ব্যবসায়ী জানান।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু বলেন, আমরা এখনো আশা হারাচ্ছিনা। আশা করছি সামনে যে সময় আছে এরমধ্যে আমরা ধান ও চাল সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফল হবো। তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই মিলারদের সাথে তাদের চুক্তিবদ্ধ চাল দেয়ার জন্যে তাগিদ দিচ্ছি। মিলাররা আমাদেরকে আশ^স্ত করেছেন নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা চুক্তি অনুযায়ী চাল সরবরাহ করবেন। আর ধান সংগ্রহের জন্য কৃষক পর্যায়ে আগ্রহ সৃষ্টির জন্যে জেলার সব উপজেলা এলাকায় প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।