লোহাগড়ায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটে : বিএনপি প্রতিনিধি দল

0

নড়াইাল ও লোহাগড়া সংবাদদাতা ॥ নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া সাহাপাড়ার কলেজছাত্র আকাশ সাহার ফেসবুকে মহানবী স. কে নিয়ে কটূক্তি নিয়ে সৃষ্ট সহিংসতার ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, দোকান ও মন্দির পরিদর্শন করেছেন বিএনপির তদন্ত প্রতিনিধি দল। শনিবার দুপুরে ওই এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কথা বলেন নেতৃবৃন্দ। এ সময় অর্থ সহায়তা দেন তারা।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলের আহ্বায়ক বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বলেছেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘর, দোকান ও মন্দিরে এ বর্বর হামলা মেনে নেয়া যায় না। সরকার তথা প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে নড়াইলে এ ঘটনা ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এটি সরকারের চরম ব্যর্থতার চিত্র। আমরা বর্বর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।
প্রতিনিধি দলের সদস্য বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে আছি। ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় আমরা মর্মাহত। সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই। আমাদের সবার একটাই পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে এটা সবাই জানেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি বর্বর এ হামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
তদন্ত প্রতিনিধি দলের সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নিপুন রায় চৌধুরী ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা ভয়ও পাবেন না, বাড়ি ছেড়েও যাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। আমরা সরকারকে বাধ্য করবো আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সাহস নিয়ে থাকবেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে লড়তে হবে। ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে বর্তমান সরকার। আজ ভোট দিতে পারছেন না। অবৈধ সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায়। রাজপথে প্রতিবাদ ও আন্দোলন করে জনগণের অধিকার আদায় করতে হবে। আজ আপনারা যেমন অসহায়, ঠিক বেগম খালেদা জিয়াও আজ তেমন অসহায়। নিজ সন্তানকে কাছে দেখতে পারছেন না। বিএনপির উপর ভরসা রাখেন। আমরা জনগণের ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই। আমরা জনগণের বাংলাদেশ করতে চাই। আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আপনাদের উপর হামলা চালিয়ে, অগ্নিসংযোগ করে দোষ একজন আরেকজনের উপর চাপাচ্ছে।
সাহাপাড়ার রাধাগোবিন্দ মন্দিরে এ সময় উপস্থিত ছিলেন তদন্ত প্রতিনিধি দলের সদস্য ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, অ্যাডভোটেক ফাহিমা নাসরীন মুন্নি, অমলেন্দু দাস অপু, নড়াইল জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ^াস জাঙ্গীর আলম, সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিয়ার রিজভী জজ, জেলা বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম পলাশ, বিএনপি নেতা রবিউল ইসলাম রবি, ইঞ্জিনিয়ার তাইবুল হাসান, মোহাম্মদ জুলফিকার আলী, আকরামুজ্জামান মিলু, আলী হাসান, জি এম নজরুল ইসলাম, কাজী সুলতানুজ্জামান সেলিম, মোজাহিদুর রহমান পলাশ,বিএনপি নেতা আবু হায়াত সাবু, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সায়াদাত কবির রুবেল, শহীদুল ইসলাম,জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফরিদ বিশ্বাসসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে ৫টি পরিবারকে ৫ হাজার করে টাকা এবং দুটি মন্দিরে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়।

লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ আবু হেনা মিলন জানান, হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক দিলীপ সাহার বাড়ি পরিদর্শনকালে অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী ও বিএনপির প্রতিনিধি দলের নেতারা এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কাপুরুষোচিত হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন,নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দোষীদের বের করতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু এ ঘটনায় উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানো হলে প্রকৃত দোষীরা পার পেয়ে যাবে। বিএনপি নেতারা দিলীপ সাহার ভাই দীপংকর সাহা ও বৃদ্ধ মা বিজলী সাহার সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে সান্ত¡না দেন। দীপংকর সাহা ও তার বিজলী সাহা গত ১৫ জুলাই ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথা তুলে ধরে বলেন,আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। নিরাপত্তায় বসবাস করা এখন আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরে তারা অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র পান ব্যবসায়ী গোবিন্দ সাহার বাড়িঘর পরিদর্শন করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর নেতৃবৃন্দ দিঘলিয়া রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি শিবনাথ সাহার সঙ্গে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানান। এখানে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন বিএনপি প্রতিনিধি দলের নেতারা।
খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, এ হামলার ঘটনায় দোষীরা শাস্তি পেলে এ ধরনের ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না। আমরা সবাই বাংলাদেশি। এখানে কোনো সম্প্রদায়গত শ্রেণি-বিভাগ না করে এক হয়ে বসবাস করতে পারলে তবেই সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় হবে, শান্তি আসবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলা হলেও, সেগুলো বিচার না হওয়ায়; একই ঘটনা বারবার ঘটছে। এসব ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মী হয়রানি করা হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ জুলাই লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া সাহাপাড়ার কলেজছাত্র আকাশ সাহা ফেসবুকে মহানবী স. কে নিয়ে কটূক্তির করায় ওইদিন জুমার নামাজের পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আকাশ সাহার গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন একপর্যায়ে সন্ধ্যার পর সাহাপাড়ার ৩টি বাড়ি ও দিঘলিয়া বাজারের দুটি দোকান ভাঙচুর করেন এবং গোবিন্দ সাহার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে দুই রুম বিশিষ্ট টিনের ঘরটি পুড়ে যায়। এছাড়া সাহাপাড়ার রাধা গোবিন্দ মন্দিরের চেয়ার ও সাউন্ডবক্স এবং আখড়াবাড়ি মন্দিরের টিনের চালা ভাঙচুর ও মহাশ্মশান কালিবাড়ি মন্দিরের ক্ষতিসাধন করে বিক্ষুব্ধরা। সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। সেই থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ২০০ থেকে ২৫০ অজ্ঞাতনামা আসামি করে লোহাগড়া থানায় মামলা দায়ের করেছে এবং এ পর্যন্ত ১০জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।