ক্যাপসিকামের বাণিজ্যিক চাষে দৃষ্টান্ত স্থাপন ঝিকরগাছার মঞ্জুরুল আলমের

0

আকরামুজ্জামান ॥ শেডের ভেতর ঢুকলে মনে হবে ক্ষেতজুড়ে রয়েছে কাঁচা-পাকা নানা রঙের টমেটো। কিন্তু একটু খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে, এটা টমেটো নয় ক্যাপসিকাম। লাল, হলুদ আর সবুজ রঙের ক্যাপসিক্যাম। যশোরের গদখালীর আদর্শ কৃষক মঞ্জুরুল আলম গত তিন বছর ধরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এ ক্যাপসিকাম চাষ করে আসছেন। এ বছর তার ক্ষেতজুড়ে ব্যাপক ক্যাপসিকাম শোভা পাচ্ছে। পলিশেডে ফগার ইরিগেশনের মাধ্যমে তাপ নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে তার এ ক্যাপসিকাম চাষে ইতিমধ্যে এলাকায় বেশ সাড়া পড়েছে। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এখানে আসছেন ক্যাপসিকামের চারা কিনতে চাষিরা।
বাজারে চাহিদার পাশাপাশি দাম ভাল হওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্যাপসিকামের চাষ করে লাভবান হচ্ছেন চাষি। কৃষি উদ্যোক্তারা বলছেন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং এর চাষ ছড়িয়ে দিতে পারলেই বিদেশী জাতের এই সবজিটির আমদানি নির্ভরতা কমবে।
ক্যাপসিকাম মূলত একটি উন্নত জাতের সবজি। ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে রয়েছে এর জনপ্রিয়তা। আমাদের দেশে এর আগে যত ক্যাপসিকাম বাজারে দেখা যেতো তা মূলত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত থেকে আমদানি করা। দেশীয় সবজি না হলেও এখন এই সবজির চাষ করা হচ্ছে যশোরে। জেলার ঝিকরগাছা, মনিরামপুর, চৌগাছাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ক্যাপসিকামের চাষ হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ঝিকরগাছা উপজেলার পটুয়াপাড়া গ্রামের মঞ্জরুল আলম ক্যাপসিকাম চাষ করে সাফল্যের নজির স্থাপন করেছেন।
কৃষক মঞ্জুরুল আলম বলেন, তিনি মূলত একজন ফুল চাষি। দেশে করোনা আসার পর কয়েক বছর ফুলের বাজারে ধস নামায় অনেকটা চিন্তিত হয়ে পড়েন। এরপর থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ক্যাপসিকাম চাষের। তবে এক্ষেত্রে প্রথমে তাকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসি (সেচ)’র পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। বিএডিসির পক্ষ থেকে তার এক বিঘা জমিতে আধুনিক পলি শেড করে দেয়া হয়। ওই শেডে বৃষ্টির পানি রিফ্রেশ করে ক্ষেতে প্রয়োগের পাশাপাশি তাপ নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ফ্যান, ফগার ইরিগেশন পদ্ধতিসহ নানা কলাকৌশল সংযোজন করা হয়। এরপর ওই শেডে ক্যাপসিকামের চাষ শুরু হয়। প্রথম বছরেই তিনি ক্যাপসিকাম চাষ করে সাফল্য অর্জন করেন। তিনি জানান, প্রথম দিকে ক্ষেত থেকে প্রতি কেজি ক্যাপসিকাম ২০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতেন। এরপর বাজারে ক্যাপসিকামের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বাড়তে থাকে। প্রতিকেজি ক্যাপসিকাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বিক্রি করেন তিনি। এ বছর তার ক্ষেতে লাল, সবুজ, হলুদ রঙের ক্যাপসিকামের চাষ হয়েছে। কিছু কিছু ফলে কালার আসছে। সামনে কয়েকদিনের মধ্যেই পুরো ক্ষেত বাহারী রঙের ক্যাপসিকামে সৌন্দর্য ছড়াবে। তিনি বলেন, এখানকার উৎপাদিত ক্যাপসিকাম যশোর শহর ছাড়াও রাজধানীর বাজারে পাঠানো হয়। পরে তা বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ক্রয় করে। বিশেষ করে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে এর ব্যবহার বেশি। বাজারে প্রতিকেজি ক্যাপসিকাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে বলে তিনি জানান।
মঞ্জুরুল আলমের এই ক্যাপসিকাম চাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নানা সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে জানান ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হাসান পলাশ। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে এনএটিপি-২ নামে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্প থেকে তাকে কৃষির নানা উপকরণ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের মাটিতে যে ক্যাপসিকাম চাষ হয় তা প্রমাণ হয়েছে। কৃষক মঞ্জুরুল আলমের এ সফলতা দেখে জেলার অন্যান্য এলাকা থেকেও চাষিরা আসছেন তার কাছ থেকে ক্যাপসিকামের চারা কিনতে। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও সীমিত পরিসরে ক্যাপসিকামের চাষ শুরু হয়েছে। আগামীতে এর পরিধি আরও বাড়বে বলে তিনি জানান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) দীপঙ্কর দাস বলেন, ক্যাপসিকাম একটি লাভজনক চাষ। আমরা কৃষককে সবসময়ই এ ধরনের লাভজনক চাষে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সহযোগিতা করে থাকি। আগামীতে জেলার অন্যান্য এলাকার চাষিরাও এ ক্যাপসিকামের চাষ করলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।