৭ শতাংশ শ্রমিক এখনো কাজে ফিরতে পারেনি: বিলস

লোকসমাজ ডেস্ক॥ করোনা মহামারিতে গত বছর ‘লকডাউনের’ সময়ে ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের ৮৭ শতাংশ শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়েছে। এদের ৭ শতাংশ এখনো কাজে ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে, ওই সময়কালে এই তিন খাতের শ্রমিকদের মোট আয় কমেছে প্রায় ৮১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ সব তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা শহরের পরিবহন, দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ এই তিন খাতের শ্রমিকদের উপর লকডাউনের প্রভাব নিরূপনে ওই গবেষণাটি করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিলস সেমিনার হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন– বিলস’র ভাইস চেয়ারম্যান ও ইন্ডাস্ট্রি অল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) নেতা আমিরুল হক আমিন এবং দুই বিলস পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ ও নাজমা ইয়াসমীন।
সংবাদ সম্মেলনে বিলস জানায়, দেশে গত বছর এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত থাকা দ্বিতীয় ধাপের ‘লকডাউনে’ ঢাকা শহরের তিনটি খাতের শ্রমিকরা কী ধরনের ক্ষতির মুখে পরেছেন তা জানার জন্য এই গবেষণা করা হয়েছে। এতে লকডাউনের সময় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, আয়ের উপর প্রভাব, সামাজিক সুরক্ষা এবং ক্ষতি পুনরুদ্ধারের তথ্য খোঁজা হয়েছে। এ জন্য তারা শ্রমিকদের ‘লকডাউনের’ আগের অবস্থার সঙ্গে লকডাউন চলাকালীন এবং লকডাউন পরবর্তী সময়ের তুলনা করে পরিস্থিতি যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন।
বিলস এর গবেষণায় দেখা যায়, লকডাউনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবহন খাতের শ্রমিকরা, শতাংশের হিসাবে প্রায় ৯৫ শতাংশ। দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে কাজ হারানোর এই হার প্রায় ৮৩ শতাংশ। তবে লকডাউনের সময়ে এ সব খাতে পূর্ণকালীন কাজ কমলেও বেড়েছে খন্ডকালীন কাজের পরিমাণ। বিলস জানিয়েছে, লকডাউনে পূর্ণকালীন কাজ কমেছে ৯৭ শতাংশ, যেখানে খন্ডকালীন কাজের পরিমাণ বেড়ে পৌঁছেছিল ২১৫ শতাংশে।
গবেষণায় দেখা যায়, লকডাউনকালে শ্রমিকরা সপ্তাহে ছয় কর্মদিবসের মধ্যে মাত্র একদিন কাজ করতে পেরেছেন। এ হিসেবে মোট কর্মদিবস কমেছে ৮৫ শতাংশ। আর মোট কর্মঘন্টা কমেছে ৯২ শতাংশ। দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল পরিবহন খাত।
বিলসের জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন খাতের প্রায় ৮৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্র ক্ষতির মুখে পরেছে। লকডাউনের মধ্যে ৯৫ শতাংশ বাস বা লেগুনা এবং ৮০ শতাংশ দোকানপাট চালাতে পারেনি মালিকরা।
কাজ হারানোর পাশাপাশি লকডাউনের সরাসরি প্রভাব ছিল আয় কমানোর ক্ষেত্রেও। ওই সময়কালে এই তিন খাতের শ্রমিকদের নিজেদের মোট আয় কমেছে প্রায় ৮১ শতাংশ। ৯৬ শতাংশ আয় হ্রাস নিয়ে এখানেও পরিবহন হচ্ছে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত। আর তাদের পরিবারের আয় কমেছে প্রায় ৭৬ শতাংশ।
বিলস জানিয়েছে, কাজে ফিরলেও আগের তুলনায় সার্বিকভাবে এখনো ৮ শতাংশ কম আয় করছেন শ্রমিকরা। অন্যদিকে, লকডাউনের সময়ে যারা কাজে টিকে ছিলেন তাদের প্রায় ৭৯ শতাংশ অনিয়মিত বেতন পেতেন। অনিয়মিত বেতনের যেই হার বর্তমানে ৩৩ শতাংশ। ফলে এই সময়ে শ্রমিকদের আয় -ব্যয়ের পার্থক্য বেড়েছে ৭৭ শতাংশ।
বিলস জানায়, লকডাউনের সময়ে এই তিন খাতের অন্তত অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) শ্রমিক তাদের মালিকদের থেকে খাদ্য, বোনাস বা থাকার জায়গার মতো সহায্য পেয়েছেন। কিন্তু এসব খাতে সরকারি সহায়তা ছিল ১ শতাংশেরও কম।
বিলস এর গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম জানান, সরকার ১ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু লকডাউনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এই তিন খাত তেমন সহায়তা পায়নি। তিনি বলেন, আমরা ৪০০ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, এর মধ্যে মাত্র তিনজন সরকারি সহায়তা পেয়েছেন।
করোনার টিকা নেয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে এই তিন খাতের শ্রমিকেরা। গবেষণায় দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৩৬ শতাংশ শ্রমিক করোনার টিকা পেয়েছেন।
এই গবেষণায় ঢাকাকে ছয়টি এলাকায় ভাগ করে সেখানকার পরিবহন, দোকান-পাট এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের ৪০০ জন শ্রমিকের তথ্য নেয়া হয়। পাশাপাশি এসব খাতের মালিকপক্ষের ৩০ জন এবং ট্রেড ইউনিয়ন, সরকারের প্রতিনিধি, এনজিও, সাংবাদিকসহ ২৫ জন বিশেষজ্ঞের মতামত নেয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিলস এর গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা কাজ করতে গিয়ে এই তিন সেক্টরের শ্রমিকদের কোন ডেটাবেজ পাইনি। তাদের ক্ষতি নিরূপণ এবং সহায়তা দানের জন্য একটি ডেটাবেজ খুবই প্রয়োজন। এছাড়া, বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ জরুরি সহায়তা তহবিল তৈরি, করোনার টিকা ও চিকিৎসা দেয়া, বীমা ব্যবস্থা চালু করা, ব্যাংক ঋণের শর্ত শিথিল করা, চাকরির নিশ্চয়তা এবং ট্রেড ইউনিয়নের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।

ভাগ