স্যারে স্বস্তি জনাবে অস্বস্তি

ইকতেদার আহমেদ
আমাদের দেশের যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের নিম্নস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা স্যার (Sir) বলে সম্বোধন করে থাকেন। শব্দটি দিয়ে সম্বোধিত হলে যেকোনো পদস্থ কর্মকর্তা তার স্বীয় অবস্থান বিবেচনায় পুলকিত বোধ করেন। অব্যবহিত উপরস্থ যেকোনো কর্মকর্তাকে স্যার সম্বোধন নিম্নস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইংরেজি Sir শব্দটি একজন ব্যক্তির প্রতি সম্মানসূচক সম্বোধন। স্যার সাধারণত উপরস্থ পুরুষ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। Sir-এর ইংরেজি সমার্থক শব্দ Mister যার সংক্ষিপ্ত রূপ Mr. Sir-এর বাংলা অর্থ জনাব, মহোদয়, মহাশয়, শ্রীযুক্ত, হুজুর প্রভৃতি। মুসলিম সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত ব্যক্তিকে লিখিতভাবে সম্বোধনে ইংরেজির ক্ষেত্রে Mr. এবং বাংলার ক্ষেত্রে জনাব শব্দটি ব্যবহৃত হয়। অনুরূপভাবে হিন্দু সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত ব্যক্তিকে লিখিতভাবে সম্বোধনে ইংরেজির ক্ষেত্রে Mr. এবং বাংলার ক্ষেত্রে শ্রীযুক্ত শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মহোদয় ও মহাশয় শব্দ দুটি বাংলায় আবেদন লিখার ক্ষেত্রে নাম ও পদবি উভয়ের আগে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত হয়। স্কুল ও কলেজের ইসলাম ধর্ম বা আরবি বিষয়ের শিক্ষক, মাদরাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের মৌখিক সম্বোধনের সময় হুজুর শব্দটির ব্যবহার সচরাচর দেখা যায়। ইংরেজি Madam শব্দটি সম্ভ্রান্ত নারী বা ভদ্র মহিলার প্রতি সম্মানসূচক সম্বোধন। যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ের পদস্থ মহিলা কর্মকর্তাদের নিম্নস্থ কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে থাকেন। সহশিক্ষা ব্যবস্থাসম্পন্ন কলেজে মহিলা শিক্ষিকাদের পুরুষ সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীরা ম্যাডাম সম্বোধন করে অভ্যস্ত। বাংলা মাধ্যমের বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষিকা ও অপরাপর শিক্ষিকাদের ছাত্রীরা বড় আপা ও আপা নাম ধরে সম্বোধন করে থাকে। অপর দিকে বাংলা মাধ্যমের বালক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক ও অপরাপর শিক্ষকদের হেড স্যার ও স্যার নাম ধরে সম্বোধন করে থাকে।
ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সহশিক্ষা ব্যবস্থাসম্পন্ন হয়ে থাকে। এসব স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা মহিলা শিক্ষিকাদের Miss এবং পুরুষ শিক্ষকদের Teacher নামে সম্বোধন করে থাকে। Miss শব্দটি Mistress এর সংক্ষিপ্ত রূপ। অধস্তন আদালতের বিচারকদের মধ্যে জেলা জজ ব্যতীত ঐতিহ্যগতভাবে একে অপরকে ইৎড়ঃযবৎ হিসেবে সম্বোধন করতেন। কিন্তু বর্তমানে পূর্বের সেই ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব অনুপস্থিত। এখন অতিরিক্ত জেলা জজগণ যেমন জেলা জজকে স্যার বলে সম্বোধন করেন, ঠিক তেমনি সহকারী জজ ও যুগ্ম জেলা জজগণও অতিরিক্ত জেলা জজকে স্যার বলে সম্বোধন করে থাকেন। উচ্চাদালতের বিচারকরা আগে একে অপরকে Brother নামে সম্বোধন করতেন কিন্তু বর্তমানে পূর্বের ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন কনিষ্ঠ বিচারকরা জ্যেষ্ঠ বিচারকদের শুধু স্যার বলে সম্বোধন করে ক্ষান্ত হচ্ছেন না বরং বিচারকদের একটি বৃহৎ অংশ প্রকাশ্যেই জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের স্যার সম্বোধন করে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যতীত পৃথিবীর অপর কোনো দেশে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মাহুতির মতো ঘটনা ঘটেনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়েছিল। অতঃপর দীর্ঘ ত্যাগ, জেল, জুলুম ও রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে উনিশ বছর পর স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটে। স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের এক বছর পর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। সংবিধান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে যদিও বলা আছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সুদীর্ঘ ১৫ বছরেরও বেশি সময় সরকারি অফিস আদালতে ইংরেজির প্রচলন অব্যাহত থাকে। বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ কার্যকর হওয়ার পর অফিস আদালতের কাজকর্মে বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও ঔপনিবেশিক মানসিকতাসম্পন্ন স্বল্পজ্ঞানসমৃদ্ধ কিছু কর্মকর্তা আইনটির প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে কখনো আন্তরিক ছিলেন না।
বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ এর ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে- এ আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস আদালত, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র আইন আদালতের সওয়াল জবাব ও অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। ওই আইনের উপধারা ৩(২)-এ বলা হয়েছে উপধারা ৩(১)-এ উল্লিখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন তা হলে উহা বেআইনি বা অকার্যকর বলে গণ্য হবে। বর্তমানে সরকারি ও আধা-সরকারি অফিস এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম শতভাগ বাংলায় সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে কারো মধ্যে কোনো সংশয় নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় নিম্ন ও উচ্চ আদালতে। নিম্ন আদালতের দাফতরিক কাজকর্ম বাংলায় সমাধা হলেও শতকরা ৫-৬ ভাগ বিচারক রায় ও সওয়াল জবাব লিখার ক্ষেত্রে ইংরেজি প্রচলন অব্যাহত রেখেছেন। উচ্চাদালতের ক্ষেত্রেও দাফতরিক কাজ বহুলাংশে বাংলায় নিষ্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু আদালতে দরখাস্ত দাখিল ও রায় লেখার কাজে এখনো ইংরেজির প্রাধান্য রয়েছে। উচ্চাদালতে ইংরেজিতে দাখিলকৃত দরখাস্ত ও রায়গুলো পর্যালোচনা করলে এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশে বাক্যের গঠনশৈলী, শব্দের বিন্যাস, ভাষার প্রয়োগ ও ব্যাকরণের ব্যবহারে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। তাই শুদ্ধ ও ত্রুটিমুক্তভাবে একটি ভাষায় ভাব প্রকাশ করতে অপরাঙ্গম হলে শুধু বিদ্যা জাহিরের অহমিকা না করে ইংরেজি পরিহার করাই শ্রেয়। তাছাড়া বাংলা ভাষা প্রচলন আইন কার্যকর হওয়ার পর ইংরেজিতে দরখাস্ত দাখিল বা রায় লেখার অবকাশ কোথায়? বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ কার্যকর হওয়ার পর আশির দশকের শেষার্ধে সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের মেধাবী, চৌকশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনৈক সহকারী সচিব তার অব্যবহিত উপরস্থ প্রধানকে জনাব সম্বোধন করলে তিনি চেয়ার থেকে আস্ফালনসহকারে দাঁড়িয়ে রক্তিম বদনে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলেন এভাবে সম্বোধন করে আপনি আমাকে অপদস্থ করতে এসেছেন? এর প্রতিউত্তরে সহজ সরল কনিষ্ঠ কর্মকর্তা আত্মপক্ষ সমর্থন করে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনের বাধ্যবাধকতা বিষয়ে কিছু বলতে উদ্যত হলে উপরস্থ কর্মকর্তা আরো উত্তেজিত হয়ে মুখায়বকে অদ্ভুত বিবৃত করে উচ্চস্বরে বললেন, আপনার আস্পর্ধাতো কম নয়, আপনার এ বেয়াদবির পরিণাম অচিরেই টের পাবেন। ঠিকই কনিষ্ঠ কর্মকর্তা সহকারী সচিব ঘটনার দুই মাস পর তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে দু-চারটি বিরূপ মন্তব্যসহ অপরাপর নিম্ন মেধার সহকর্মীর চেয়ে অবমূল্যায়িত হলেন। উপরস্থ কর্মকর্তা উপসচিবের অতীত খুঁজতে গিয়ে জানা যায় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অধিকাংশ কর্মকর্তা যখন চাকরি ছেড়ে দেশে অবস্থান ও দেশ ত্যাগ করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের সন্ধিক্ষণের প্রায় মাস দেড়েক আগে একটি প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে যোগদান করে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন। তাছাড়া তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অবলোকনে জানা যায় মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি পর্যন্ত তার দু-তিনটি তৃতীয় বিভাগ রয়েছে যা তিনি যে পদে প্রেষণে আসীন ছিলেন সে পদ সংশ্লেষে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত। তথ্যানুসন্ধানে আরো জানা যায়, তার বাবা মহকুমা হাকিম কার্যালয়ের বিশেষ এক ধরনের করণিক পদে নিয়োজিত ছিলেন যে পদে উৎকোচ বকশিস বিবেচনায় তৎকালীন সমাজের ঔদাসীন্যতায় কিছুটা সহনীয় ছিল। পরবর্তীতে তার চাকরিজীবনে তার চরিত্রে এ যোগ্যতাটির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এরই প্রভাবে তার অধীন কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতা গৌণ গণ্যে তাকে নগদ ও দ্রব্যসামগ্রী দ্বারা সন্তুষ্টির মধ্যে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের মূল্যায়ন নির্ভর করত। যে কারণে তার নামের আগে চোরা শব্দটির অলঙ্করণ স্থায়ী রূপ পেয়েছে। এখন ওই অলঙ্করণ ব্যতীত তার নামটি উচ্চারিত হতে শোনা যায় না। একদা কোনো একটি জেলা শহরস্থ স্বনামধন্য বালিকা বিদ্যালয়ের নবাগত অযোগ্য ও অপদার্থ প্রধান শিক্ষিকাকে সহকর্মী ও ছাত্রীরা বড় আপা সম্বোধন করলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন আমার আমলে এসব চলবে না। আমাকে আপনারা/তোমরা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করবেন/করবে। এর অন্যথা যেন না হয়। এ বিষয়ে জনৈক বাংলার শিক্ষিকা বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭ এর বরখেলাপ হচ্ছে উল্লেখ করলে প্রধান শিক্ষিকা অনুশাসনের সুরে বলে ওঠেন, রাখেন আপনার বাংলা ভাষা প্রচলন আইন। এ বাংলা ভাষা করে করেই তো আজ আপনারা বিশ্বদরবারে নিজেদের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হলেও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এমন অনেক দেশ ও জাতি রয়েছে যেসব দেশ ও জাতির নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তা নিজ দেশ, জাতি ও ভাষার সম্মান রক্ষার্থে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ইংরেজি কথোপকথনে সক্ষমতা থাকলেও গ্লানিময় বিবেচনায় দোভাষীর মাধ্যমে মাতৃভাষায় কথোপকথনে স্বাচ্ছন্দ্য ও গর্ববোধ করেন। এ দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া, ইরান, জার্মানি প্রভৃতি। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এর উল্টোটিই বেশি পরিলক্ষিত হয়। আমাদের নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তাদের শুদ্ধভাবে ইংরেজি বলতে না পারার বিষয়টিকে এক ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়। আর যে নেতৃবৃন্দ ও কর্মকর্তা শুদ্ধভাবে ইংরেজি বলতে পারেন তারা বিষয়টি নিয়ে গর্ববোধ করেন। আমরা নিজেদের আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি। এর ধারাবাহিকতায় ২১ ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আমাদের যেকোনো নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দ বা পদস্থ কর্মকর্তা ইংরেজি শুদ্ধভাবে বলতে বা লিখতে না পারুক তাতে দোষের কিছু নেই কিন্তু যখন এ ধরনের নেতৃবৃন্দ বা কর্মকর্তা শুদ্ধভাবে বাংলা বলনে ও লিখনে ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে বলনে বাধাগ্রস্ত করেন, তখন জাতি হিসেবে আক্ষেপ করা ছাড়া আমার আর কী-বা করার আছে?
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ভাগ