লোহাগড়ায় নগদ এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ শিশুদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের

শিমুল হাসান,লোহাগড়া(নড়াইল)॥ নড়াইলের লোহাগড়ায় ‘নগদ’ এজেন্ট ও ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি নিজেই তুলে নিচ্ছেন শিশুদের উপবৃত্তির লাখ লাখ টাকা। এমন ঘটনায় গতকাল বুধবার ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এদিকে প্রধান শিক্ষকও উপজেলা জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। লোহাগড়া উপজেলার শালনগর ইউনিয়নের মাকড়াইল দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের এ ঘটনা ঘটেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাকড়াইল দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৮৮। প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা মাসে ৭৫ টাকা এবং প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পায় মাসে ১৫০ টাকা। সাধারণত তিন বা ছয় মাস পরপর শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা দেয় সরকার। উপবৃত্তির টাকা শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মোবাইলে ‘নগদ’ একাউন্টে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর অভিভাবকই স্বল্প শিক্ষিত এবং মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম সম্পর্কে অজ্ঞ। নগদ একাউন্ট থাকলেও একাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের গোপন পিন নম্বরটি তারা জানেন না বা কীভাবে টাকা উত্তোলন করতে হয় বোঝেন না। আর তাই অভিভাবকরা সহযোগিতা নেন বিদ্যালয় বা বাজার পাশর্^বর্তী ‘নগদ’ এজেন্টে ব্যবসায়ীর।
গ্রামের এই সব মানুষ বা অভিভাবকরা উপবৃত্তির টাকার ক্ষুদে বার্তা (এসএমএস) মোবাইলে পেলে টাকা উত্তোলন করতে ছুটে যান কাছের নগদ এজেন্টের দোকানে। আর নগদ এর এজেন্ট অভিভাবকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে শিশুদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ করেন।
ওই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ইকরামুলের মা নাজমা বেগম অভিযোগ করেন, আমার ছেলের উপবৃত্তির প্রথম কিস্তির ৪শ’৫০ টাকা এবং দ্বিতীয় কিস্তির ৯শ’৫০ টাকা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তুলে নিয়েছেন মাকড়াইল নতুন বাজারের নগদ এজেন্ট মো. ফয়জুর রহমান সিকদার।
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র তামিম শেখের মা নাসরিন বেগম জানান, নগদ এজেন্ট ফয়জুর রহমান সিকদার আমার একাউন্ট থেকে ১৮শ’ টাকা তুলে নিয়েছেন। এবছর আমি কোনো টাকা হাতে পাইনি।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মেঘলা আক্তার জুই এর অভিভাবক মাহফুজার খান অভিযোগ করেন, গত ২০ জুনের পর ওই এজেন্ট আমার মোবাইল থেকে মিথ্যা কথা বলে ১৮শ’ টাকা তুলে নিয়ে এখন অস্বীকার করছেন।
শিশু শ্রেণির ছাত্রী রিমার মা সোনিয়া বলেন, ওই এজেন্ট ৪শ’৫০ টাকা আত্মসাৎ করার পর গ্রাম্য মাতুব্বরদের চাপে পরের দিন টাকা ফেরত দিয়েছেন।
অভিভাবক জায়েদা বেগম বলেন, আমার পোতা প্রিন্স পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। এতিম। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত উপবৃত্তির কোনো টাকা হাতে পাইনি। অভিভাবক আছিয়া, রিমা, সাবিনাসহ অন্তত ২০ জন বুধবার বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জানান, আমরা সরল বিশ^াসে নগদ একাউন্টের টাকা উত্তোলন করতে মো. ফয়জুর রহমান সিকদারের দোকানে যাই। আমাদের সকলের একাউন্টের গোপন পিন নম্বর ফয়জুর জানেন। এমনকি কখনোই আমাদের পিন নম্বর আমাদেরকে দেন না। তাই টাকা তুলতে গেলে তার কাছেই যেতে হয়। টাকার এসএমএস মোবাইলে ঢুকলে আমরা ফয়জুরের দোকানে যাই। ফয়জুর ১০/১২ মিনিট আমাদের মোবাইল ঘাটাঘাটি করবার পরে জানায় একাউন্টে টাকা আসেনি। আবার কখনো কখনো জানায় পিন নাম্বার না বলতে পারলে টাকা পাওয়া যাবে না। অথচ পিন নাম্বার ফয়জুর একাই জানেন। আমরা বিশেষ মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছি নগদ অ্যাপসের মাধ্যমে ফয়জুর আমাদের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে।
শিক্ষকসহ নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গ্রামের একাধিক লোক জানান, এ পর্যন্ত উপবৃত্তির অন্তত ২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে নগদ এজেন্ট ব্যবসায়ী ফয়জুর। এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় অভিভাবকরা মুখ খুলতে সাহস পাননা। ফয়জুরের নগদ একাউন্ট মোবাইল নং-০১৯৯৬-২৭৬৫৫২।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি খান মো. সুফিয়ার রহমান জানান, অভিভাবকরা নগদ এজেন্ট ফয়জুরের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হিমায়েত হোসেন এ বিষয়ে বলেন, অভিভাবকরা নগদ এজেন্ট ফয়জুরের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগ পাওয়ার পর আমি নিজেও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের দফতরে এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগদ এজেন্ট ব্যবসায়ী অভিযুক্ত মো. ফয়জুর রহমান সিকদার নিজেকে মাকড়াইল ১নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি পরিচয় দিয়ে বলেন, গ্রাম্য শত্রুতায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। আমি কারো টাকা আত্মসাৎ করিনি।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. সাইফুজ্জামান খান এ বিষয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি শিক্ষার্থীদের আত্মসাৎ হওয়া টাকা উদ্ধার হবে। এটি বড় ধরণের চুরি। প্রয়োজনে এ বিষয়ে মামলা দায়ের করা হবে।

ভাগ