বেনাপোল স্থল বন্দরে রাজস্ব ঘাটতির ধারা অব্যাহত

সুন্দর সাহা ॥ দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে ক্রমেই কমছে রাজস্ব আহরণ। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায় ল্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা কম হয়েছে। কাস্টম কমিশনার বলছেন, ‘আমদানি কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় কমে গেছে, আর কোন কারণ নেই’। তবে স্থলবন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, কর্মকর্তদের অনিয়মের কারণে রাজস্ব আদায়ে এ ঘাটতি। এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার কোন আশার বাণী শোনাতে পারেননি কাস্টমস কর্মকর্তারা।
বেনাপোল কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের ল্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৯১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ে ৫৫৩ কোটি ৮০ লাখ, আগস্টে ৫০৬ কোটি ২৯ লাখ, সেপ্টেম্বরে ৪০৫ কোটি ১০ লাখ, অক্টোবরে ৪২৮ কোটি ৩১ লাখ, নভেম্বরে ৫৩৩ কোটি ৯২ লাখ ও ডিসেম্বরে ৪৮৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে গত ছয় মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১ হাজার ৫৪৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি থেকে গেছে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এ স্থলবন্দরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা এবং এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছর রাজস্ব ঘাটতি ছিল ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সে বছরের চেয়ে গত বছর ঘাঠতির পরিমাণ বাড়ে ৯৬৬ কোটি টাকা। আর গত এক বছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসেই ঘাটতির গিয়ে ঠেকেছে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি ১৩ লাখ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়। সেই হিসেবেই স্থলবন্দরে ৫ হাজার কোটি টাকার অধিক রাজস্ব আদায় হওয়ার কথা। পণ্য আমদানির বেলায় এ স্থলবন্দরে চলে নানা অনিয়ম। কখনো পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা, আবার ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য এনে সরকারের শুল্ক ফাঁকি দেয়া হয়। এতে শুল্ক আয় কমে যাচ্ছে। তবে বৈধভাবে বাণিজ্যের েেত্র কড়াকড়ি আরোপ করায় রাজস্ব ঘাটতির কারণ বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, দেশের চলমান ১৩ টি বন্দরের প্রধান হচ্ছে বেনাপোল স্থলবন্দর। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে পণ্য আমদানির জন্য দেশে যতগুলো বন্দর রয়েছে, তার মধ্যে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর হলো বেনাপোল। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের অন্য যেকোনো বন্দরের তুলনায় উন্নত। বেনাপোল থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। সে কারণে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
এ বিষয়ে সিএন্ডএফ এজেন্টরা বলছেন, এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা কাস্টমস কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এটাও রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ। এছাড়া বৈধ আমদানি চালান কাস্টমস কর্তৃক পরীা-নিরীার পর সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া আবার বিজিবি সদস্যরা তা আটক করছে। সেখানে ২-৩ দিন পণ্য চালান আটকে থাকছে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিজিবি আর কাস্টমসের মধ্যে পরস্পরের সমন্বয় দরকার। এসব অনিয়মের কারণে দিন দিন এ বন্দরে রাজস্ব আদায়ে ধস নামছে। এছাড়াও সারাদিন বেনাপোল কাস্টমস হাউজে কর্মকর্তারা নিজেদের মিটিং করে সময় পার করে দেন। এর ফলে ঠিকমত চেয়ারে বসেন না অনেক কর্মকর্তারা। এটাও রাজস্ব আদায়ের অন্যতম কারন বলে ব্যবসায়িদের অভিমত। আজমিরী ইন্টান্যমনালের মালিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক আবু তাহের ভারত বলেন, ‘একদিকে ভারতের ১৮ শতাংশ জিএসটি-র মানতে চান না বেনাপোল কাস্টম। অন্যদিকে বেনাপোলে কাস্টমসের অহেতুক বাড়াবাড়িতে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের নাভিঃশ্বাস উঠেছে। লোডেড ভ্যালু, ডাটা ভ্যালুসহ কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মনগড়া সব ভ্যালুর চাপে আমদানিকারকরা বেনাপোল বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়া পণ্য আমদানি করা পণ্যের চট্রগ্রামসহ অন্য বন্দরের চেয়ে ভ্যালু বেশি হলে সেটা কখনও কখনও কাস্টম কর্তৃপক্ষ মেনে নেন। কিন্তু কম হলে মানেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেন কাস্টমসের জেসি, ডিসি, এসি ও সুপাররা। তাদের অনৈতিক সুবিধা নেয়াসহ নিয়ম বহির্ভূত মনগড়া চাপের কারনেই বেনাপোলে বিপুল পরিমান রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে।’ এবিষয়ে সিএন্ডএফ এজেন্ট নূরুজ্জামান লিটন লোকসমাজকে বলেন,‘ কাস্টমসের অনিযমের কারনে আমদানিকারকরা বেনাপোল দিয়ে পণ্য আনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এখানে মূল্য বেশি, ভ্যালু বেশি। আমদানিকারকরা যে সুবিধা চান সেই সুবিধা পান না। তাছাড়া বিভিন্ন ভাবে হয়রানির শিকার হন ব্যবসায়িরা। ভারত থেকে পণ্য আসতে দেরি হয়। কখনও কখনও পণ্য আসতে ১০/১২ দিন লেগে যায়। এসব কারনে বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি করতে চান না ।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ’চট্রগ্রাম বন্দরে যে পণ্যের ভালু ৩৫ সেন্ট, বেনাপোলে কাস্টমস তার ভ্যালু ধার্য করছেন এক ডলার। এসব অসামাঞ্জস্যতার কারনেই বেনাপোলে রাজস্ব আদায়ে ধস্ নেমেছে।’ বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, সব বন্দরে আমদানি পণ্যের ওপর রাজস্ব পরিশোধের নিয়ম এক হতে হবে। সমজাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরে যে হারে রাজস্ব আদায় করা হবে, বেনাপোল বন্দরে ওই সেই পণ্যের ওপর একই হারে শুল্ক আদায় করতে হবে।েএটা না হ্ওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস্ নেমেছে বলে তনি িমন্তব্য করেন।
এসব বিষয়ে বেনাপোল কাস্টমসের কমিশনার বেলাল হুসাইন চৌধুরী লোকসমাজকে বলেন,“ টোটাল আমদানি কম হয়েছে বলে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। যেমন চেসিস গতবছর যা এসেছিল, এবার তার ৪০ শতাংশও আসেনি। ৬০ শতাংশ চেসিস কম এসেছে। আমার রাজস্ব চেসিস থেকে বেশি আসে। আমদানি না হলে রাজস্ব কোথা থেকে আসবে। ঘরে চাল না থাকলে আমি খাওয়াব কি করে?” তিনি আরও বলেন, “বিদেশ থেকে আমদানির উপর রাজস্ব আদায় নির্ভর করে। ভারত থেকে আগের মত এখন মাল আসছে না। ভারত থেকে জেএসটি করে ফাঁকিজুকি দিয়ে মার আনছে। আমি এগুলো এলাউ করি না। রাজস্ব ঘাটতির এটাও একটা কারণ। এ স্থলবন্দরে কাস্টমস আইন এবং নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে প্রয়োগ সহ নানান কারনে বেনাপোলে পণ্য আমদানি কমে গেছে। আর এসব কানে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে।”

ভাগ