শীত মৌসুমে যশোরে খেজুরের রস ও গুড় থেকে ১২০ কোটি টাকার আয়ের স্বপ্ন

0
ছবি: লোকসমাজ।

আকরামুজ্জামান ॥ হেমন্তের সূচনায় কাশফুলের ডগায় জমছে শিশির ফোঁটা। রাতের বেলা খোলা আকাশের নিচে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে ভিজে যাচ্ছে মাথা। আবহওয়ার এ পরিবর্তন জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। আর শীত মানেই পিঠা-পায়েস। খেজুরের রস আর গুড়ের সাথে যার নিবিড় সম্পর্ক। আসন্ন মৌসুমে যশোরে খেজুরের রস আর গুড় বিকিয়ে ১২০ কোটি টাকারও বেশি আয়ের স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতির ভেতর দিয়ে যশোরের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প পেয়েছে স্বাতন্ত্র। তাই দেশ-বিদেশের এর বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। যদিও পরিচর্যার অভাবে গাছ কমার সাথে সাথে বাড়ছে এর আনুসঙ্গিক ব্যয়। তাই সম্ভাবনার সাথে তৈরি হয়েছে শঙ্কাও।

যশোরের খাজুরা এলাকার গাছি আবদুর রহিম, মোমরেজ আলী ও নূর আলীদের কাছে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি কেবল মৌসুমি কাজ নয়; এটি বংশপরম্পরায় পাওয়া পেশা ও ঐতিহ্য। বছরের পর বছর এ কাজে যুক্ত থাকলেও বর্তমানে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ খেজুরগাছের স্বল্পতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও শ্রমের তুলনায় আয় নিশ্চিতের আশঙ্কা। তাই তারা এ ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ চান। চান জনগণের সচেতনতা।

শীত শীত ভাব শুরু হওয়ায় খেজুরের গুড় তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে আগেভাগে। এখন সময় গাছ খেজুর রসের জন্যে উপযোগী করার। গাছিরা তাই প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গাছিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক মণ জ্বালানি কাঠ কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। ভালো মানের একটি দা- য়ের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এ দা দিয়ে গাছ তোলা বা পরিষ্কার করা হয়। দরকার পড়ে মাটির ঠিলা বা ভাড়ের। সাথে লাগে শক্ত দড়ি। এসব উপকরণের দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তাই বাড়ছে রস ও গুড়ের দাম। সে দাম মানুষের নাগালের ভেতর থাকবে কি – না তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। এ কারণে ব্যবসা হবে কি- না তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গাছিরা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি খেজুরগাছ থেকে পুরো মৌসুমে প্রায় ৭ থেকে ৮ কেজি গুড় পাওয়া যায়। তবে গাছের উৎপাদনক্ষমতা, রসের পরিমাণ ও মৌসুমের দৈর্ঘ্যের ওপর রস প্রাপ্তি নির্ভর করে। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে গাছিদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা কঠিন।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে শীত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড় ঘিরে ১২০ কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চলে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায় খেজুরের গুড় ও পাটালি। জিআই স্বীকৃতির পর নতুন বাজার তৈরির সুযোগ বেড়েছে।

কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের যেমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, তেমন রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে আমরা উৎসাহিত করছি।

তবে জিআই স্বীকৃতি পেলেই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়বে কিংবা উৎপাদকদের আয় নিশ্চিত হবে-এমন নয়। এজন্যে নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে গুড় তৈরি, মানসম্মত মোড়কজাতকরণ, সংরক্ষণ ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে অনেকে মত দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুরগাছ ব্যবহারের কারণে গাছের সংখ্যা কমছে। পাশাপাশি নতুন গাছ লাগানো ও পরিচর্যার অভাব ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ভিত্তিকে দুর্বল করছে। অন্যদিকে শ্রমসাধ্য কাজ, দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও আয়ের অনিশ্চয়তায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে এ পেশার প্রতি আগ্রহ কমছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু বাজারের আকার বাড়ানো নয়, উৎপাদনের মূল কারিগর গাছিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। উৎপাদকদের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের সরাসরি সংযোগ, সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা ও উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ তাদের আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

পাশাপাশি নতুন খেজুরগাছ রোপণ, চারার পরিচর্যা, উপযুক্ত এলাকায় গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপদে গাছে ওঠানামার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। অভিজ্ঞ গাছিদের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এ শিল্পের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।